গল্পঃ ডিয়ার হোম মিনিষ্টার | পর্বঃ (১)



আমি বিছানা থেকে এক লাফে উঠে দাড়ালাম । আমার বিস্মিত দৃষ্টিটা এখনও বিছানার উপরে পড়ে থাকা দেহটার উপর নিবদ্ধ ! আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না । আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি । হয়তো এসবের কোন কিছুই সত্য না । একটু পরে আমি আবার ঘুম থেকে জেগে উঠবো এবং দেখবো যে সব আগের মত স্বাভাবিক আছে ।


কিছু সময় আমি মৃত দেহটার দিকে তাকিয়ে রইলাম । সাদা বিছানায় জমে থাকা শক্তের দিকেও তাকিয়ে রইলাম । রক্ত দেখলে আমার সারাজীবন শরীরে খানিকটা কাঁপন ধরে যায় । তাজা রক্ত দেখতে পারি না বলেই আমি ডাক্তারি পড়ার সাহস করতে পারি নি । বাবার খুব ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও । এমন কি সামান্য গরু ছাগলের জবাইয়ের দৃশ্যও আমার সহ্য হয় না ঠিক ।


আর সেই আমি কি না একটা রক্তাক্ত মানুষের সাথে রাত ভয় ঘুমিয়ে ছিলাম । আমার এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে ।


কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম আসলে আমি স্বপ্ন দেখছি না, যা চোখের সামনে দেখছি তা আসলেই বাস্তব তখন মাথার ভেতরে একটা বোমা ফাঁটতে শুরু করলো ! এখন আমি কি করবো ?


আমার ঘরে একটা নগ্ন মেয়ে পড়ে আছে মৃত অবস্থায় !


দুনিয়ার কোন মানুষ এটা কখনই বিশ্বাস করবে না যে এই খুনের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই ।


এমন কি নিকিতা নিজেও এই কথা বিশ্বাস করবে না । এই পরিস্থিতিতে আমি থাকলেও হয়তো ওকে বিশ্বাস করতাম না । সে আমাকে নিশ্চিত ভাবে দোষী ভাববে ! সে আমাকে ভাববে আমি রাতে মেয়েটিকে এখানে নিয়ে এসেছি এবং মেয়েটিকে মেরে ফেলেছি !


আমি মেয়েটির দিকে আরও ভাল করে তাকিয়ে রইলাম কিছু সময় । মেয়েটির যে আকর্ষনীয় শরীর সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । পেছন দিকে ওর পুরো শরীরটা দেখা যাচ্ছে । শরীরে এক ফোটা মেড আমি দেখতে পেলাম না । হাত দুটো কেউ পেছন দিকে দিয়ে শক্ত একটা সাথে বেঁধে রেখেছে । তারপরই মেয়েটাকে খুন করেছে । মেয়েটার শরীরের ঠিক কোথায় আঘাত করা হয়েছে সেটা জানতে হলে আমার মেয়েটিকে এক পাশে সরাতে হবে । কিন্তু আমার সেটা করতে ইচ্ছে হল না । আমি এমন কি মেয়েটার চেহারা পর্যন্ত এখনও দেখি নি । এসব দেখে আমার মোটেও লাভ নেই !


আমি এখন কি করবো ?


কিছুটা সময় পরে আমার মাথাটা একটু শান্ত হয়ে এল । আমি এখন চিন্তা করতে লাগলাম এই ঝামেলা থেকে আমি কিভাবে মুক্তি পাবো ?


কোন উপায় কি আছে ?


একটু চিন্তা করতে লাগলাম ।


কয়েকটা আশার ব্যাপার আছে ! কয়েকটা সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি !


প্রথম সম্ভবনা হচ্ছে আমাকে এখন এখান থেকে সবার আগে বেরিয়ে যেতে হবে । কেউ কিছু টের পেয়ে যাওয়ার আগেই । এর থেকে সহজ আর ভাল বুদ্ধি আর হয় না । আমাকে এখন কেউ যদি এখানে এই লাশের সাথে দেখে এক ঘরে তাহলে আমার আসলে কোন আশাই নেই । যদিও এভাবে পালিয়ে যাওয়াটাও আমার কাছে ভাল লাগছে না । এভাবে পালিয়ে যাওয়া মানেই হচ্ছে নিজেকে অপরাধী প্রমান করা । কিন্তু আমি এখানে থাকলেও সেটা হবে ।


দ্বিতীয় আশার কথা হচ্ছে আমাকে এখানে কেউ চিনে না । গতদিনই আমি সেটা টের পেয়েছিলাম । মানষের চোখের দিকে তাকালেই সেটা আমি বেশ ভাল ভাবেই বুঝতে পারি । এই রিসোর্টটার মানুষ খুব একটা আসে না । ঢাকার পাশের শহর হলেও এটা বেশ অখ্যাত একটা রিসোর্ট ! এই জন্যই আমি এইটা বেছে নিয়েছিলাম । এখন কোন ভাবে এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারলেই সব ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে !


তৃতীয় আশার কথা হচ্ছে, এখানে এন্ট্রি নেওয়ার সময় আমি আমার আসল পরিচয় দেই নি । আমার একটা ফেইক আইডি আছে । নিকিতাকে আইডিটা বানিয়ে দিতে বলেছিলাম । কি কারনে বলেছিলাম সেটা অবশ্য আমার নিজেরও ঠিক জানা নেই । একটা কারন হতে পারে যে সব স্থানে আমার পরিচিত পরিচয়টা দিতে ইচ্ছে করে না । আমার কেবল মনে হয় এই পরিচয়টা আমার নিজের অর্জিত নয়, নিকিতার কারনে পাওয়া । তাই মাঝে মাঝে এমন নির্জন স্থানে যখন আসি তখন আমি এই ফেইক আইডিটা ব্যবহার করি । আইডি অনুযায়ী আমার নাম সাইদ মাহমুদ এবং আমি ইন্টারনাল ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা !


আমি দ্রুত আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম । অবশ্য খুব বেশি কিছু আমি সাথে করে আনিও নি । আর ব্যাগ থেকে সব কিছু বেরও করি নি ।দরকারি জিনিস গুলো ব্যাগে ভরে নিলাম । তারপর তৈরি হতে খুব বেশি সময় লাগলো না । দরজা দিয়ে বের হতে যাবো তখন নিজের কৌতুহলকে আমি দমন করতে পারলাম না । আবার ফিরে এলাম । তারপর মেয়েটিকে চেহারাটা হাত দিয়ে আমার দিকে ফেরালাম !


সাথে সাথেই আমার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুটো আওয়াজ বের হয়ে এল ! আমি এই সকালবেলা তৃতীয়বারের মত ধাক্কাটা খেলাম !


মেয়েটিকে আমি খুব ভাল করেই চিনি !


নওরিন আফরোজ !


এই সময়কার জনপ্রিয় মডেল এবং অভিনেত্রী !


আই মাই গড !


আমি এ কোন বিপদে পড়লাম !


আমি এতো সময় ধরে নিজেকে যতখানিক শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলাম সেটা এবার একেবারে উবে গেল । আমার বুকের মাঝে এবার তীব্র একটা আতংকের সৃষ্টি হল । এই কাজটা যেই করে থাকুক না কেন সে করেছে খুব প্লান করেই । আমাকে সব দিক দিয়ে আটকাতেই কাজটা করেছে !


কাজটা কে করতে পারে ?


আমার মাথায় কেবল একজনের নামই এল !


নিকিতার বাবা !


এই মানুষটাই আমাকে সব থেকে বেশি অপছন্দ করে ! সে চায় নি আমি নিকিতার সাথে থাকি । আমাকে হত্যা করার সে উঠে পড়ে লেগেছিলো । তারপরেও আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম । নিকিতাকে অনুরোধ করেছিলাম যা হয়েছে সব ভুলে গিয়ে তাকে যেন ফিরিয়ে আনা হয় । আমার মনে হয়েছে যে যা করেছে সব নিকিতার জন্য । আমার সাথে তার ব্যক্তিগত কোন বিরোধ ছিল না । ভেবেছিলাম সব বুঝি মিটে গেছে ।


কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে সব কিছু মিটে যায় নি !


আমি দরজা বন্ধ করে বের হয়ে এলাম । সকাল এখনও ভাল ভাল ভাবে হয় নি । নির্জন রিসোর্ট টা এখন আরও বেশি নির্জন মনে হচ্ছে । আমার লক্ষ্য যে কারো চোখে পড়ার আগেই এখান থেকে বের হয়ে যাও । তবে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হওয়া গেল না । দরজার কাছে রিসিপশনে একজন ঠিকই বসে আছে । আমাকে দেখেই হাসি মুখে উঠে দাড়ালো ।


-স্যার কি চেক আউট করবেন ?


আমি নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রান চেষ্টা করালম । তারপর বলল, আসলে আমার এখনই ঢাকাতে যাওয়ার দরকার !


-কিন্তু স্যার আমাদের এখানে আসলে আট টার আগে চেক আউট করার নিয়ম নেই ! আমাদের রুম সার্ভিস সাড়ে সাতটার পর থেকে চালু হয় !


-দেখুন দরকার না পড়লে আমি যেতাম না । আমি অগ্রিম দুইদিনের পেমেন্ট করেই রেখেছি । আর আপনার নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে না যে আমি আপনাদের ওয়াশ থেকে সাবান স্যাম্পু নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি যে সব চেক করে দেখতে হবে !


-না না স্যার কি বলছেন এসব !


-তাহলে কি মনে হচ্ছে ? আমি আমার ঘরে কাউকে খুন করে রেখে এসেছি । সেটা আপনাদের চেক করতে হবে ?


এবার ছেলেটি হেসে ফেলল । তারপর বলল, স্যার আসলে আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে সাড়ে সাতটার আগে এখান থেকে কোন যানবাহন পাবেন না আপনি । এটা শহর থেকে একটু দুরে । তাই আমাদের নিজেদের গাড়ি আছে যেটা দিয়ে আমরা গেস্ট দের শহরে পৌছে দেই । বিশেষ করে যারা গাড়ি ছাড়া আসে । আপনার সাথে তো গাড়ি নেই । তাই বলছিলাম ....


আমি খানিকটা বিরক্ত কন্ঠে বললাম, আপনাদের গাড়ির জন্য আমার অপেক্ষা করলে চলবে না । আমার জন্য গাড়ি আসছে !


একটা মিথ্যা কথা বলে দিলাম । তারপর বললাম, আমাকে এখনই যেতে হবে । এই নিন রুমের চাবি !


ছেলেটা আর কিছু বললাম না । আমি দ্রুত পায়ে গেট দিয়ে বের হয়ে এলাম ।


রাস্তাটা পাকা হলেও বেশ সরু । এক সাথে দুটো মাইক্রবাস পার হতে কষ্ট হয়ে যাবে । এদিক দিয়ে কোন বাস চলে না । আমাকে সামনের এগিয়ে যেতে হবে । কোন বেবিট্যাক্সি কিংবা ভ্যান রিক্সা যাই পাই না কেন সেটা নিয়ে শহরের দিকে যেতে হবে । কেউ কিছু বোঝার আগেই আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে !


আমি দ্রুত পায়ে এগিয়ে যেতে থাকি সামনের দিকে । মাথার ভেতরে তখনও কেবল নওরিন আফরিজের কথা ঘুর পাক খাচ্ছে ! মেয়েটা এখানে কিভাবে এল ! মেয়েটার এখানে আশার কোন কারন নেই ! আমার এবার সত্যিই ভয় করতে শুরু করলো । বুঝতে বাকি রইলো না যে এবার হয়তো আমার আর রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে না ।

|

|

চলবে......??

Next Post
No Comment
Add Comment
comment url