গল্পঃ ডিয়ার হোম মিনিষ্টার | পর্বঃ (২)
নিকিতার সাথে আমার যে বছর বিয়ে হয়েছিলো তার পরের বছর বই মেলাতে আমার দুইটা বই বের হয় । একটা উপন্যাস আরেকটা ছোট গল্প সংকলন । বই দুটো আমি নিজের টাকা দিয়েই আসলে প্রকাশ করেছিলাম প্রথমে । খানিকটা নিরবে । কাউকে কিছু না বলে । টুকটাক যে লেখালিখি করতাম সেটা একান্তই নিজের জন্য । একটা দুটো বই বের করার শখ ছিল । সেই শখ থেকেই বই বের করা । আমি ভেবেছিলাম যে বড় জোর একশ কপি বের হবে । আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু স্টুডেন্ট কিনবে, কিছু পরিচিত মানুষ কিনবে- ব্যস এখানেই আমার শখ পূরন শেষ হবে !
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে দুটো বই ই বেস্ট সেলার হয়ে গেল । প্রথম সংস্করন টা আমি নিজের টাকা দিয়ে করলেও পরের মোট দশটা সংস্করন টা প্রকাশন নিজের টাকা দিয়ে বের করলেন । তারপর আমার অপেক্ষা করতে হয় নি । কেবল মেলাতেই নই সারা বছরই আমার বই বের হতে লাগলো এবং সেগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলো । যদিও আমি জানি যে প্রত্যেক্ষ না হলেও নিকিতার এর পেছনে একটা পরক্ষ প্রভাব ঠিকই ছিল । হয়তো নিকিতার সাথে আমার বিয়ে না হলে আমাকে মানুষজন এভাবে চিনতো না, আমার বই এভাবে বিক্রিও হতো না । জীবন হয়তো তখন অন্য রকম হত ।
নওরিনের সাথে আমার পরিচয় হয় মাস ছয়েক আগে । নিকিতার রাজনৈতিক পার্টির এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম আমি ওর সাথে । স্বাধারনত এই সব পার্টিতে আমি যাই না । আমার বিরক্ত লাগে । ওরা নানান বিষয় নিয়ে কথা বলে আড্ডা দেয়, আমার কিছু করার থাকে না । আমি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই । আমি তাই করছিলাম । এমন সময় একজন হঠাৎ আমার পেছনে একজন এসে হাজির হল । একটা নোট বুক বের করে দিয়ে বলল, অটোগ্রাফ, প্লিজ ।
আমি খানিকটা অবাক হলাম । এখনকার দিনে আলাদা নোটবুকে লেখকদের অটোগ্রাফ কেউ নেয় না । আগে একটা সময় পাঠকদের একটা আলাদা খাতা কিংবা নোট বুক থাকতো । সেখানে তারা তাদের পছন্দের লেখকদের অটোগ্রাফ সংগ্রহ করতেন । এখন যাও বা অটোগ্রাফ নেয় সেটা কেবল বইয়ের সামনের পাতায় । এখন সবাই সেলফি তোলে । তারপর সেটা ফেসবুকে পোস্ট করে ।
সেখানে আমার অটোগ্রাফ নিচ্ছে ! আমি খানিকটা কৌতুহল নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালাম ।
কিছু সময় লাগলো আমার নওরিনকে চিনতে । এই রকম পার্টিতে নাট্য ফিল্ম জগতের অনেকেই হাজির থাকে । এর আগেও দেখেছি আমি । নওরিন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো । তারপর বলল, কি লেখক সাহেব কি অটোগ্রাফ দিবে না ?
আমি হাসলাম । তারপর নোটবুকটা হাতে নিলাম ।
তারপর থেকেই নওরিনের সাথে আমার মাঝে মাঝেই দেখা হতে লাগলো । তারপর এক সময় সে আমার ফেসবুকে এড হয়ে গেল । মাঝে মাঝেই সে আমাকে নক দিও । নানান বিষয়ে আমার কাছে জানতে চাইতো ! আমি বেশ অবাকই হয়ে ছিলাম যে ওর মত এতো ব্যস্ত একজন মডেল আমার বই পড়ে । এবং কেবল পড়েই না রীতিমত গবেষণা করে । মাঝে মাঝে কথা বলার সময় আমার মনে হয় আমার লেখার ব্যাপারে আমার থেকে নওরিনই যেন বেশি ভাল জানে । অন্তত কথা বলতে গেলে আমার তো তাই মনে হয় !
মেয়েটা মাঝে মাঝেই আমার সাথে দেখা করতে চাইতো । আমি সেটা এড়িয়ে যেতাম । একজন পাঠক আর লেখকের মাঝে যতটুকু সম্পর্ক হওয়ার দরকার আমি সেটার বেশি দুর এগিয়ে যেতে আগ্রহী ছিলাম না ।
আর আজকে এই মেয়ে আমার পাশে মরে পড়ে আছে । পুলিশের খুব বেশি সময় লাগবে এটা বের করতে যে নওরিনের সাথে আমার যোগাযোগ ছিল । ফোন রেকর্ড আর ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জার বের করলেই সেটা বের হয়ে যাবে ।
যখন আমি রিসোর্টের রুম থেকে বের হচ্ছিলাম তখন মনের ভেতরে একটা আশা ছিল যে এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারলেই একটা উপায় থাকবে যে এই ঝামেলা থেকে আমি নিজেকে বের করতে পারবো । আমার তখন এই আশা ছিল যে মেয়েটাকে আমি চিনবো না । আর যে মেয়েটাকে আমি চিনি না তাকে হত্যা করার কোন কারন আমার কাছে থাকবে না । কিন্তু এখন ব্যাপারটা একেবারেই উল্টো ! আমি মেয়েটাকে খুব ভাল করে চিনি !
আমি রিসোর্ট থেকে বের হয়ে সোজা হাটা দিলাম শহরের দিকে । একমনে হল নিজের গাড়িটা না এনে হয়তো ভালই করেছি । গাড়ি আসলে আমাকে খুজে বের করতে আরও শহজ হত ওদের জন্য । এখনও হয়তো একটা ক্ষণ সম্ভবনা আছে যে ওরা আমাকে খুজে পাবে । টের পাবে না যে রাতে এই রুমে কে ছিল । সে আইডি দেওয়া আছে সেখানে গিয়ে দেখবে সেখানে অন্য কেউ বসে আছে ।
এখন আমাকে আর কেউ না দেখলেই হয় ! এমন একটা ভাবনা আসতেই আমাকে পেছন থেকে কেউ ডাক দিল । আমি প্রথমে ডাকটা ঠিক বুঝতে পারলাম না । আমার মাথা একটু গরম ছিল বিধায় নিজের নিজের ফেইক নামটা আমি ঠিক চিনতে পারি নি । যখন গাড়িটা আমার পাশে এসে থামলো তখন চেহারাটা চিনতে পারলাম ।
গতকাল রাতে এই লোকটাই আমার পাশে বসে ড্রিংক করছিলো । আমার সাথে টুকটাক কথা বলছিলো । আমিও কিছু কথা বলছিলাম ।
লোকটা একটু হেসে বলল, কোথায় যাচ্ছেন এতো সকালে ?
আমি ততক্ষনে নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়েছি । বললাম, আসলে আমার এখনই একটু ঢাকা যাওয়া দরকার । জরুরী কল এসেছে !
-ও আচ্ছা ! আমি ভাবছিলাম গতকালকের মত আজকেও আপনার সাথে গল্প করা যাবে । বুঝেনই তো একা একা ড্রিংক করে মজা নেই।
আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম । আমার মনযোগ আসলে তখনও পেছনের দিকে । যদিও হাটতে হাটতে আমি বেশ দুরেই চলে এসেছি রিসোর্ট থেকে । তবুও আমার মনে এই ভয়টা রয়েই গেছে যে এখনই বুঝি আমি কোন চিৎকার শুনতে পাবো ! কেউ হয়তো এখনই দৌড়ে আসবে আমাকে ধরার জন্য !
লোকটা বলল, তো আমি কি হেটেই যাবেন ? এখান দিয়ে তো পাবলিক বাস যায় না !
-তাই ভাবছি ।
-এক কাজ করতে পারি !
-বলুন !
-আপনাকে আমি শহর পর্যন্ত পৌছে দিতে পারি । কাল রাতে আপনি আমাকে যথেষ্ট পরিমান সঙ্গ দিয়েছেন । এই টুকু তো করতেই পারি।
আমি খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়ে গেলাম । এই কথা সত্য যে গতকাল রাতে তার সাথে একটু ড্রিংক করেছি তবে সেটা খুব বেশি সঙ্গ দিয়েছি বলে মনে পড়লো না । তবুও এখন এর থেকে ভাল অপশন আমি দেখতে পাচ্ছি না । আমি আর কিছু না ভেবে গাড়িতে উঠে পড়লাম ।
শহরের পৌছাতে আরও আধা ঘন্টা লাগলো । এই অবস্থায় ভদ্রলোক অনেক কথা বললেন । সে একজন সরকারি অফিসার । মাঝে মাঝে এখানে আসেন । জায়গাটা বেশ নির্জন আর এখানকার ওয়ানেই সংগ্রহটা বেশ ভাল । লোকটার নাম আবরার ইসলাম । আমি নিজের ফেেইক আইডির নাম বললাম । আমি কি করি সেটা বললাম । আমার চেষ্টা রইলো যাতে আমার আচরন কম অস্বাভাবিক মন হয় । কিন্তু নিজের ভেতরে কি চলছে সেটা কেবল আমি নিজে জানি ।
বিকেল বেলার ভেতরে সারা দেশের সব পত্রিকায় এটা শীর্ষ নিউজ হয়ে গেল যে মুন্সিগঞ্জের এক অখ্যাত রিসোর্টে জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী নওরিন আফরোজের মৃতদেহ পাওয়া গেছে । তাকে হত্যা করা হয়েছে । তাকে যার ঘর থেকে পাওয়া গেছে তার নাম সাইদ মাহমুদ । ইণ্টারনাল ব্যাংকের একজন কর্মকতা । সে সকাল বেলাতেই রিসোর্ট ছেড়ে পালিয়ে গেছে । পুলিশ সাইদ মাহমুদকে খুজছে ।
আমি দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম । আমার কেন জানি মনে হল পুলিশ আমাকে খুব জলদিই খুজে বের করবে । আমার আসল বেরিয়ে যাবে খুব জলদি ! আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না । নিকিতার কাছে সত্যটা বলবো কি না বুঝতে পারছিলাম না । ও কি আমাকে বিশ্বাস করবে ?
নিকিতা আমাকে ভালবাসে আমি জানি । আমাকে সে বিশ্বাস করে ! কিন্তু এই ব্যাপারে কি সে বিশ্বাস করবে ?
আমি যদি নিকিতার জায়গাতে থাকতাম তাহলে কি আমি নিকিতাকে বিশ্বাস করতে পারতাম ?
আমি জানি না !
কিন্তু আমি মাঝে মাঝে ভুলে যাই নিকিতা কতখানিক ক্ষমতাবান মানুষ । তার কাছ থেকে সব কিছু লুকিয়ে রাখা মুশকিল ! যদিও সে দেশের বাইরে রয়েছে তবুও তার কাছে সব খবর পৌছে গেছে । আমার সব খবর তার কাছে পৌছে গেছে ।
রাতের বেলা আমার কাছে নিকিতার ফোন চলে এল ! কোন প্রকার ভূমিকা না করেই নিকিতা বলল, অপু !
আমি নিজেকে যথা সম্ভব শান্ত রেখে বললাম, বল ! কি খবর তোমার ? তোমার কনফারেন্স ....
-আর ইউ ওকে ?
-হ্যা !
-অপু আমাকে কি কিছু বলতে চাও ?
-আই লাভ ইউ !
-এটা না ! অন্য কিছু ? এমন কিছু যে আমার জানা দরকার ?
-আমার জানা মতে তুমি আমার ব্যাপারে সব জানো !
-আমিও তাই জানতাম ! তবে একজন মানুষের পক্ষে সব কিছু জানা সম্ভব না । বিশেষ করে মানুষের মনে কি চলে । যাই হোক আমি তোমার উপর সব সময় চোখ রাখি কারন আমি চাইনা তুমি আমার বিপদে পড় । তুমি জানো আমি তোমার ব্যাপারে চিন্তিত । তবে আমি এটাও আশা করি যে তুমি আমার কাছে সব সত্য বল ।
-আমি তোমার কাছে কিছু লুকাই না । তুমি জানো এটা !
-ওকে । আপাতত আমি রাখছি ।
আমি ফোন রেখে ছিলাম । মনের ভেতরে একটা তীব্র ইচ্ছে করছিলো যে নিকিতাকে সব সত্য বলে দেই । কিন্তু কেন জানি বলতে পারলাম না । কারন জানতাম যে বললে সেটা হাস্যকর শোনাবে ।
রাত ঠিক ১২টার দিকে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে একটা ফোন এসে হাজির হল । রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নারী কন্ঠ শুনতে পেলাম । কেবল একটা লাইন শুনতে পেলাম ! "পুলিশ আপনার ঘরে পৌছে যাবে আধা ঘন্টার ভেতরে .।"
লাইন কেটে গেল । আমি জানি কয়েকটা মুহুর্ত চুপ করে বসে রইলাম কেবল । আমার ভেতরে থেকে কেবল একটা আওয়াজই বের হয়ে এল ।
"পালাও অপু ! তোমাকে পালাতে হবে"
|
|
চলবে....??
