পর্বঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (৪)
তৃষার কথাঃ
আমার কাছে মনে হল যেন পুরো বিয়েবাড়ির সকল আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেছে । সব আওয়াজ ছাপিয়ে আমি কেবল আমার মায়ের ফোঁপানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছি । মা বারবার কেবল বিড়বিড় করে বলছে,
-আমার মেয়েটার কি হবে ! আমার মেয়েটার কি হবে !
আমি মায়ের মাথায় হাত বুলাতে লাগলাম । কেন জানি কান্না এলো না । অথচ আমার কান্না আসা উচিৎ । এমন একটা ঘটনা ঘটলে যে কোন মেয়েই কান্নাকাটি করবে এটাই স্বাভাবিক । আমিও কেঁদেছিলাম প্রথমবার যখন এমনটা হয়েছিলো ।
আমার তখন বয়স কত হবে ?
সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি । বয়স আঠারো পুরো হয় নি । ততদিনে অবশ্য আমার সাথে দুর্ঘটনাটা ঘটে গেছে । আমার বাবার তখন মাথা খারাপ হয়ে আছে । তার কাছে কেবল এই কথাটাই মনে হচ্ছে যে, যেকোন ভাবেই হোক আমার বিয়ে দিতে হবে । একমাত্র বিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যবে ।
আমার পরিচিত জগতটা তখন কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছে। সবাই আমার দিকে কেমন চোখে তাকায় । তাদের চোখে মুখে একটা করুণার হাসি দেখা যায় । আবার কেউ কেউ আড়ালে আবডালে আমাকে টিটকারীও মারে । যদিও মুখের উপরে কেউ কিছু বলে না । তবে সেই সব কথা আমার কানে আসে । কেবল আমার কানেই না, আমার পরিবারের মানুষের কানেও যায় ! তখন আমারও কেন জানি মনে হচ্ছিলো যে বিয়ে দিলেই হয়তো মানুষজনের কথা বন্ধ হবে । সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে । তাই বিয়ের জন্য আমি রাজিও হয়ে গিয়েছিলাম ।
সেই ছেলেটার চেহারা এখনও আমার মনে আছে । খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম ছেলেটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে । একটু গরীব ঘরের ছেলে । ঠিকমত পড়াশুনার খরচ চালাতে পারে না । তবে ছেলে হিসাবে খুবই ভাল । আর দেখতে শুনতেও বেশ । প্রথম দেখাতেই আমার কেন জানি ছেলেটাকে পছন্দ হয়ে গেল । বলতে গেলে সেই কিশোরী বয়সের প্রথম প্রেমের অনুভূতি আমার সেই ছেলেটাকে দেখেই হয়েছিলো।
মনে মনে ছেলেটাকে আমি আমার মনের মানুষ হিসাবে ভাবতে শুরু করলাম । বিয়ের আগেই আমি মনে মনে ঠিক করে রাখলাম যে বাসর রাতে তাকে কি কি কথা বলবো । কত কথা আমার জমা ছিল তাকে বলার । সবার আগে আমি তার ভুল ভাঙ্গাবো ! লোকে যা বলে সেটা যে ঠিক না সেটা আমি তাকে আস্বস্ত করবো ।
হ্যা, আমার ধারণা ছিল যে বাবা তাকে আমার ব্যাপারে সব কিছু আগেই বলেছে । কিন্তু আমার জানায় খানিকটা ভুল ছিল । বাবা দূর্ঘটনার কথাটা ছেলেটাকে বলে নি । ছেলেটা সম্ভবত জানতে পারে বিয়ের দিন সকালবেলা । তারপর তারা আর আসে নি । আমরা বর আসার জন্য অপেক্ষা করলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত । কিন্তু তারা আর এল না ।
সেদিন রাতে আমি দরজা বন্ধ করে খুব কেঁদেছিলাম । আমার জমিয়ে রাখা কথাগুলো আর বলা হল না । মনের ভেতরেই মরে গেল সেই কথাগুলো। কেউ শুনলো না । কেউ জানলো না । আর হয়তো কোনদিন জানবেও না । সেই দিন প্রথমবারের মত নিজেকে আমার বড় ছোট আর অপমানিত মনে হয়েছিলো । এমন একটা অপরাধের শাস্তি আমাকে দেওয়া হচ্ছিলো যার পেছনে আমার কোন হাত ছিল না । এই পুরো পৃথিবীকে বড় নিষ্ঠুর মনে হচ্ছিলো খুব ।
বাবা বেশ কিছু সময় দরজা ধাক্কাধাক্কি করলো । আমি দরজা খুললাম না । তারপর দেখি বাবা জানালার কাছে এসে উঁকি দিচ্ছে । আমার মনে আছে বাবা সারারাত ঐ জানালার পাশেই বসে ছিল আমার দিকে তাকিয়ে । তার মনে আসলে ভয় ছিল যে আমি হয়তো এই রাতে উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেলবো ।
তারপর থেকে আমি মনে মনে শক্ত হয়ে গিয়েছিলাম । নিজের মনকে শান্ত করে নিয়েছিলাম । যে সব সম্পর্ক আমার জন্য আসতো, আমি সবার আগে এটাই ভেবে নিতাম যে এইখানে আমার বিয়ে হবে না । এটাও ঠিক আগের মতই হবে । এতে কষ্ট কম হত ।
কিন্তু এই বিয়ের বেলাতে আমি আবারও খানিকটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম । সত্যিই ঐদিন সেলিম আঙ্কেলের কথা শুনে আমার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো যে আমার জন্য আসলেই ভাল কিছু অপেক্ষা করছে বলেই এতোদিন এতো কষ্ট আমি পেয়ে এসেছি । কিন্তু সেই অপেক্ষার সম্ভবত শেষ নেই । সেটা চলতে থাকবে আরও বহুদিন । কিংবা হয়তো অনন্ত কাল ।
আমি মাকে খানিকটা শান্ত করে বললাম,
-বাবা কোথায় ?
মা যেন আরও একটু জোড়ে ফুঁপিয়ে উঠলো । আমার কেন জানি হঠাৎ খুব বিরক্ত লাগলো । কি বাচ্চা মেয়েদের মত কান্নাকাটি করছে । আমি আবারও বললাম,
-বাবা কোথায় ?
-জানি না । তোর সবুজ ভাইকে নিয়ে কোথায় যেন গেল । জানি না কোথায় গেছে !
আমি একটু নিশ্চিন্ত বোধ করলাম । সবুজ ভাই যেহেতু বাবার সাথে আছে সেহেতু খুব একটা চিন্তার কারন নেই । সে-ই সামলে নিবে বাবাকে । কিন্তু বাইরের মানুষগুলোকে কিভাবে সামলাবো ?
আমি মাকে বিছানার উপর খানিকটা শুইয়ে দিয়ে নিজে দরজার দিকে হাটা দিলাম । যারা যারা এসেছে আগে তাদের খাইয়ে দেওয়া যাক । একবার যখন বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার কথাটা সবাই জেনে যাবে তখন হয়তো আর খাওয়া হবে না কারো । এতোগুলো খাবার নষ্ট হবে ! এর থেকে আগে থেকেই অতিথিদের খাইয়ে দেওয়া যাক !
আমি বাইরে আসতেই কিছু সময়ের জন্য থমকে গেলাম । এতো সময় মায়ের কান্নার আওয়াজ ছাপিয়ে কানে আর কিছু আসছিলো না কিন্তু এখন বিয়ে বাড়ির চিৎকার চেঁচামেচি হঠাৎ করেই আমাকে খানিকটা সময়ের জন্য কেমন যেন বিমুঢ় করে দিল । আমি কিছু সময় বিহ্বলের মত দাঁড়িয়ে রইলাম । এখনও কেউ ঠিক লক্ষ্য করে নি যে আমি ঘরের বাইরে বের হয়েছি এবং এই মানুষগুলোর কোন ধারণাই নেই যে, যে বিয়ের দাওয়াত তারা খেতে এসেছে সেটা আর হচ্ছে না ।
আমি কিছু সময় এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম । কি করবো ঠিক বুঝতে পারলাম না । ঠিক সেই সময়েই ডলি ভাবীকে দেখলাম আমার দিকে এগিয়ে আসতে । আমার কাছে এসে ডলি ভাবি বলল,
-কি হল তৃষা ? বাইরে বের হয়ে এলে যে ?
ভাবীর চেহারা দেখেও আমার মনে হল যে তিনি কিছুই জানেন না । তাকে এখন কিছু জানাতে ইচ্ছে হল না । আমি ভাবিকে বললাম,
-ভাবী, গেস্টদের খাওয়ানো শুরু করে দেন !
ভাবী খানিকটা অবাক হয়ে বলল,
-কি বল ? বয়যাত্রীর আগে কনেপক্ষ খাবে ? ব্যাপারটা কেমন হবে ?
আর বর পক্ষ ! তারা আসলে তো ! আমি মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বললাম,
-ভাবী, বাবা ফোন দিয়েছিলো ! বরপক্ষের আসতে নাকি আরও একটু দেরি হবে ! গাড়ি নাকি নষ্ট হয়ে গেছে । তাই ওদের আসার আগেই আমাদের গেস্টদের খাইয়ে দিতে বলল !
ভাবী বলল,
-আচ্ছা, এই জন্য মামাকে দ্রুত চলে যেতে দেখলাম !
-হ্যা ! বাবা গেছে সেখানে ! হয়তো দুই তিনটা গাড়ি নিয়ে যাবে ভাড়া করে ! আপনি চিন্তা না করে খাওয়া দাওয়া শুরু করে দেন !
ভাবীর চেহারা দেখে মনে হল আমার কথাটা তার ঠিক পছন্দ হল না । তবে সে আর কিছু জানতে চাইলো না । পেছন ঘুরে হাটা দিল !
আমি আবারও নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালাম ! কিন্তু মাঝপথে আমাকে থামতে হল । তাকিয়ে দেখি সিমু আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-ইশ, তোকে কত্ত সুন্দর লাগছে ! ইঞ্জিনিয়ার সাহেব বেশ লাকি রে !
গ্রামের ভেতরে এই মেয়েটাই আমার সব থেকে কাছের বন্ধু । এই মেয়েটা সবসময় আমার পাশে থেকেছে । ক্লাসে যখন অন্য মানুষেরা আমাকে কিছু বলতো কিংবা বলার চেষ্টা করতো এই সিমুই সবার আগে এগিয়ে আসতো ! আমি কিছু বলতে পারতাম না কিন্তু সিমু মোটেই সহ্য করতো না সে সব !
সিমুকে কি বলবো সব কথা !
শুনে ও কি করবে ?
নিশ্চয়ই মন খারাপ করবে ! কান্নাকাটিও করতে পারে । আমি ওকে খানিকটা জড়িয়ে ধরলাম। বুকের ভেতরে একটু শান্তি শান্তি লাগলো কিছু সময়ের জন্য ! তারপর সিমুকে ছেড়ে দিয়ে বললাম,
-শোন, তুই আগে খেয়ে নে !
-সে কি কেন ? এখনও তো বর পক্ষ আসে নি ।
-না আসুক ! ওদের আসতে একটু দেরি হবে । তুই আগে খেয়ে নে তো !
আমি ওকে পাশ কাটাতে চাইলাম কিন্তু কাজ হল না । সিমু আমার চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেলল কিছু একটা হয়েছে । আমার দিকে তাকিয়ে কঠিন চোখে বলল,
-কি হয়েছে ? সত্যি করে বল ?
আমি মুখে হাসি ফুটিয়ে বলার চেষ্টা করলাম যে কিছু হয় নি কিন্তু কেন জানি কোন স্বর বের হল না । নিজের কন্ঠ শুনে নিজেই খানিকটা চমকে উঠলাম ! আমি কাঁদছি কেন ?
আমার চোখে তখন গেল ডান দিকে । গ্রামের আরও কিছু মেয়েরা তখন এগিয়ে আসছে আমার দিকে । সিমু সেদিকে তাকিয়ে আমার হাত ধরে টান দিয়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল । তারপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে আমার দিকে ভাল করে তাকালো ।
আমার চোখ দিয়ে তখন পানি পড়তে শুরু করেছে । আমি খুব চেষ্টা করছি পানি আটকানোর কিন্তু কেন জানি আটকাতে পারছি না মোটেও ! সিমু এবার বেশ কিছু সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখলো । আমি বেশ কিছু সময় কাঁদলাম ওকে জড়িয়ে ধরেই ।
খানিকটা শান্ত হলে সিমু বলল, কি হয়েছে বলবি ?
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই পেছন থেকে মায়ের কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম । মা শুয়ে ছিলো এতো সময় । এখন উঠে দাঁড়িয়েছে । তার চোখে মুখে কান্নার রেশ মাত্র নেই । বরং সেখানে খানিকটা কাঠিন্য দেখতে পেলাম । মা বলল,
-হবে আর কি ! হয়েছে আমার কপাল ! কি দোষে যে তোকে পেটে ধরেছিলাম !
মা অবশ্য এমনটা প্রতিবারই বলে । প্রতিবার বিয়ে ভাঙ্গার পর কিংবা ছেলে পক্ষ যখন বিয়ের জন্য পিছিয়ে যায় তখন প্রথমে খুব কান্নাকাটি করবে ! তারপর সব দোষ আমার উপর দিয়ে দিবে ! মা কঠিন কন্ঠে বলল,
-তোর সাথেই কেন এমন হয় ! অন্য কোন মেয়ের বেলায় তো এমন হয় না ! তোর সাথে কেন হবে এসব ?
সিমু বলল,
-আহ, আন্টি ! কি বলছেন আপনি ! এমনভাবে কেন বলছেন ?
-তো কি বলবো? যে মেয়ের বিয়ে এতোবার ভেঙ্গে যায়, তাহলে দোষ আর কার ! লোকে যে বলে, এমনি এমনি বলে না !
মা আমার দিকে ভয়ংকর চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বের হয়ে গেল রুম থেকে । সিমু আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-কি হয়েছে ! বিয়ে ভেঙ্গে গেছে মানে কি ?
আমি মাথা নিচু করে বললাম,
-বর নাকি পালিয়ে গেছে । সে বিয়ে করবে না !
-মানে কি ! তাহলে এসব নাটকের দরকার কি ছিল ! আগে থেকে বললেই তো হত !
আমি কোন কথা না বলে চুপচাপ তাকিয়ে রইলাম কেবল ! সিমু আবারও আমাকে জড়িয়ে ধরলো । তবে মুখ দিয়ে কোন কথা বলল না । হয়তো সান্ত্বনা দেওয়ার কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না ।
আমি হঠাৎ বললাম,
-আমার খুব ঘুম আসছে রে !
কথাটা একেবারে মিথ্যা না । কাল রাত থেকে আমার সত্যিই ঘুম আসে নি । নিজের বিয়ে নিয়ে আমি সত্যিই একটু উত্তেজিত ছিলাম । আনন্দময় উত্তেজনা ! সকালে উঠে পার্লারে গিয়ে সেজেগুজে আসা ! সত্যিই এখন খানিকটা ক্লান্ত লাগছে আমার ! রাতে সিমু আমার সাথেই ছিল । সিমু জানে আমার অবস্থা ! সিমু বলল,
-চল একটু শুবি ।
আমি বিছানাতে গা এলিয়ে শুয়ে পরলাম । ইচ্ছে হল শরীর থেকে সব গহনা খুলে ফেলি । বিয়ের এই পোশাকটাও খুলে ফেলতে মন চাইলো । কিন্তু তারপর কি মনে হল যে খুললাম না । সিমুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম । অনুভব করলাম ও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । চোখের কোনে একটু যেন পানি জমে উঠলো । একটু পরে অনুভব করলাম সিমু হাত দিয়ে সেই অশ্রুটুকু মুছে দিচ্ছে । আমি নিশ্চিত এই সময়ে ওর নিজের চোখও ভিজে উঠেছে । পরম মমতা নিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
|
|
চলবে....??
