গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (৩)
নিলয়ের কথাঃ
কিছু সময় আমি এদিক ওদিক দেখতে থাকলাম । এখনও আমার মাথা ঠিকমত কাজ করছে না । এমনকি আমি ঠিক বিশ্বাসও করতে পারছি না যে ভাইয়া বিয়ের গাড়ি থেকে পালিয়েছে । এতো বড় সাহস ভাইয়ার কিভাবে হল সেটা আমি সত্যিই বুঝতে পারলাম না । ভাইয়া তো এতোটা সাহসী হওয়ার কথা না । কোন ভাবেই না ।
আমার কেবল মনে হচ্ছে যে আমি হয়তো স্বপ্ন দেখছি । গাড়িতে আমি আর ভাইয়া ছাড়া আর কেউ ছিল না । আমি আপন মনে মোবাইল টিপছিলাম । ভাইয়াও আমার সাথে কোন কথাবার্তা বলছিলো না । এমন হতে পারে যে আমি তখন ঘুমিয়ে পড়েছি। সেখানেই স্বপ্নটা দেখেছি । যে কোন সময় গাড়ির ঝাঁঁকি খেয়ে আবার জেগে উঠতে পারি ।
-ভাইজান !
আমি পাশ ফিরে তাকালাম । গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁঁড়িয়ে ছিলাম । আর ভাবছিলাম হয়তো আমি স্বপ্ন দেখছি । কিন্তু মনজুরের ডাক শুনে ওর দিকে ফিরে তাকাতে হল ।
মনজুরের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-কাজটা কি হল বলতো?
মনজুর খুব ভাবনাতে পড়ে গেল যেন । কিছু সময় এদিক ওদিক মাথা নাড়ালো । তারপর বলল,
-একটা কাজ করা যায় !
-কি কাজ?
-চলেন আমরা দুইজন ঐ গাছ-গাছালীর ভেতরে খোঁঁজ শুরু করি । ফয়সাল ভাই নিশ্চয়ই খুব বেশি দূরে যাইতে পারে নাই । আমরা যদি দুইজন দুই দিকে দৌড় শুরু করি তাহলে আমাদের চোখে পড়ে যাবেই । তখন না হয় ধরে আনা যাবে ।
-যাবে ?
-অবশ্যই যাবে । আমার মামা ঠিক এইভাবে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলো । সে কোনভাবেই বিয়ে করবে না । পাত্রী নাকি তার পছন্দ হয় নি । বরযাত্রী রওয়ানা দেওয়ার আগেই সে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেল । তারপর কি হল জানেন ? আমার আব্বা আর আমার নানা দুইজন মিলে তার পিছে সে কি দৌড় ! আমার নানার দৌড় যদি আপনে দেখছেন ।
আমি মনজুরের দিকে তাকিয়ে আছি । তার চোখটা চকচক করছে, যেন সে চোখের সামনে সেই দৌড়ের দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে।
আমি বললাম,
-তুমি নিজে দেখেছো এই দৃশ্য ?
-আরে না । মায়ের মুখে শোনা । তখন তো আমার জন্মই হয় নাই । সবেমাত্র আব্বা আর মায়ের বিয়ে হয়েছে ।
আমি মনজুরের মামার বিয়ের আসর থেকে পালানোর গল্প শোনার আগ্রহবোধ করলাম না । আমার সামনে চিন্তা করার মত আরও বড় ব্যাপার আছে । ভাইয়া পালিয়েছে ২০ মিনিটের বেশি পার হয়ে গেছে । এতো সময়ে কত দূর গিয়েছে কে জানে । এদিকে পেছনের গাড়িগুলোর কোন দেখা নেই । ওরা পেছনে ছিল বুঝলাম কিন্তু এতোটা পেছনে পড়েছে সেটা তো বুঝতে পারি নি । কখন আসবে কে জানে !
-ভাইজান !
-বল ?
-মানে আমি বলতে চাইতেছিলাম যে এইখানে থাকাটা কি ভাল হবে ?
-মানে ? ভাল হবে না কেন ?
-না মানে স্যার তো কেমন রাগী জানেনই । এখন বড় ভাইজান চলে গেল আপনার চোখের সামনে ! স্যার ব্যাপারটা কেমন করে নিবে ! একবার ভেবে দেখেছেন ?
চিন্তা যে আমার হচ্ছে না সেটা আমি বলবো না । আমার কেবলই ভয় লাগছে যে বাবা যখন জানতে পারবে ভাইয়া চলে গেছে তখন তার মনের ভাব কেমন হবে ! আমাকে যে কোন ভাবেই হোক এটা বোঝাতে হবে যে এই ঘটনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই । ভাইয়া যে পালিয়ে যাবে সেই ব্যাপারে আমার কোন হাত নেই । আমার বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না যে ভাইয়া এমন একটা কাজ করতে পারে । আগে থেকে জানলে আমি এমনটা হতে দিতাম না ।
আমার মাথায় অবশ্য আরেকটা চিন্তা এসেছে । বারবার মনে হচ্ছে এখানে এখন না থাকাটাই ভাল । আব্বার মাথা গরম হয়ে গেলে সে যাকে সামনে পায় তারই খবর খারাপ করে দেয় ! ভাইয়ার রাগ না আবার আমার উপরে গিয়ে পড়ে । কিন্তু এখন যদি আমি পালিয়ে যাই তাহলে এটাই প্রমাণিত হয়ে যাবে যে আমিও এই ঘটনার ভেতরে আছি । আমিও দোষী প্রমাণিত হব । এর থেকে বরং না যাই । আমি যে নিরাপরাধ সেটা প্রমাণ করতে মনজুর আমাকে সাহায্য করবে । সে অন্তত জানে ।
আমি আব্বার আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম । খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না। রাস্তার দিকে তাকাতেই গাড়ির বহরটা দেখতে পেলাম । মোট এগারোটা গাড়ি । কেবল আমাদের এই গাড়িটাই কার গাড়ি । অন্য সবগুলোই হায়েস নেওয়া হয়েছে । সবার সামনের গাড়িটা এসে থামলো আমাদের গাড়ির পাশেই । সবার আগে সেখান থেকে আব্বাই নামলেন । আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-আরে আমরা অন্য দিকে চলে গিয়েছিলাম । বেটা আহাম্মক ড্রাইভার রাস্তা চেনে না । ভালই করেছো আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ।
আব্বা মনে করেছেন যে আমরা তার জন্য অপেক্ষা করছি । আসলে ঘটনা আমি তাকে কিভাবে বলবো সেটা এখনও ঠিক বুঝতে পারছি না ।
আব্বা তারপর বললেন,
-ফয়সাল কোথায় ?
আমি একবার মনজুরের দিকে তাকালাম । মনজুর আমার দিকে তাকালো । চোখের ইশারাতে আমাকেই বলতে বলল । আমি ওকে ইশারা করলাম বলার জন্য কিন্তু কাজ হল না । আব্বা আবারও জানতে চাইলেন,
-কি ব্যাপার কথা বলছো না কেন ? ফয়সাল কোথায় ? এমনিতেও অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে! আমাদের এখনই রওয়ানা দিতে হবে !
আমি জোরে একটা দম নিলাম । যা ঘটে গেছে সেটা তো বলতেই হবে । কোনভাবেই সেটা এড়ানো যাবে না । আমি আস্তে করে বললাম,
-ভাইয়া নেই !
আব্বা যেন আমার কথাটা ঠিকমত বুঝতে পারলেন না । ভাইয়া যে এই বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যেতে পারে এটা সম্ভবত আব্বার মাথাতেই আসছে না । তার বড় ছেলে তার কথার বিরুদ্ধে কোনদিন যায় নি । যা তিনি বলেছেন সেটাই বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছে । আর সেই ছেলে কি না এমনভাবে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যাবে ? এমন একটা চিন্তা কখনই আব্বার মাথায় আসতে পারে না । আমি এটা খুব ভাল করেই জানি । আব্বা আবার বললেন,
-কি বললে?
এবার আমাকে কিছু বলতে হল না । মনজুর পাশ থেকে বলল,
-স্যার, ভাইজান পালাইছে । সে বিয়ে করতো না । আমারে বলল গাড়ি থামাইতে । সে নাকি প্রোস্রাব করবে । আমি গাড়ি থামাইলাম । ভাবলাম বিয়া করতে যাইতেছে । নিশ্চয়ই খুব টেনশনে আছে । এই সময়ে একটু মুতের বেগ আসতেই পারে ! গাড়ি থামতেই সে ঐ দিকে দৌড় দিল । আমরা বইসা আছি তো আছি । এক সময় মনে হইল যে ঘটনা তো ঠিক ঠেকতাছে না । তখন আমি আর তানভীর ভাই নাইমা গেলাম সেদিকে । দুইজন দুই দিকে খোঁজাখুঁজি করলাম । কিন্তু নাই ! হেতি নাই । একেবারে যেন গায়েব হইয়া গেছে !
মনজুর সব সময়ই একটু বাড়িয়ে বলে । তবে আজকে কেন জানি ওর বাড়িয়ে কথা বলার কারণএ খুব একটা রাগ করতে পারলাম না । মনজুর নিজের মত করে বেশ কিছু ঘটনা যুক্ত করেছে । যেমন আমরা মোটেই এদিক ওদিক খোঁজাখুঁঁজি করি নি । মনজুর তো গাড়ি থেকেই নামে নি ঠিকমত । আমি একটু গিয়েছি এই যা । ফোন দিয়েছিলাম । প্রথমবার রিং হওয়ার পরে সেটা বন্ধ পাই !
আব্বা কিছু সময় আমার আর মনজুরের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন । আমি অবশ্য ভেবেছিলাম আব্বা ভয়ানক রেগে যাবেন । তবে আব্বার চোখে আমি রাগ দেখলাম না। তার বদলে দেখতে পেলাম বিস্ময় ! তিনি সম্ভবত এতো বড় ধাক্কা এর আগে কোনদিন খান নি । আশাও করেন নি । তাও আবার ভাইয়ার কাছ থেকে এমন কিছু যে আসবে সেটা তিনি ভাবতেও পারছেন না । এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না যেন তার !
তবে আমাকে অবাক করে দিয়ে আব্বা একদমই রাগ করলেন না । কেমন যেন গাড়িতে হেলাম নিয়ে দাঁঁড়িয়ে গেলেন! আমি দ্রুত আব্বার দিকে এগিয়ে গেলাম । তার হাত ধরলাম ! আমিও ভাইয়ার মত আব্বাকে ভয়ই পেয়েছি। তার থেকে সবসময় দূরে দূরে থাকারই চেষ্টা করেছি । তবে ভয় ছাড়াও আমি কখনো এটাও চেষ্টা করি নি যে আমার কারণে আব্বার নাম খারাপ হোক । যদিও আব্বা তার বড় ছেলেকে নিয়েই সবসময় বেশি গর্বিত ছিলেন । সেটার পেছনে কারণও ছিল বেশ । তবে আমার সেটা নিয়ে দুঃখ ছিল না !
আমি আব্বার হাত ধরতেই অনুভব করলাম যে আব্বাও আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন । আমার দিকে ভরসা হারানো চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছু সময় । আমি আব্বার চোখের দিকে তাকিয়ে খানিকটা চিন্তিত হয়ে গেলাম । আব্বাকে আমি এইরকম দেখে অভ্যস্ত নই । নিজের কাছেই কেমন অসহায় লাগছে আমার । ভাইয়ার উপর একটু রাগ হল । যদি ভাইয়া একটু সাহস করে আগেই আব্বাকে কথাটা বলতো তাহলে আজকে এই দিন দেখতে হত না । সেই সাহস সে দেখালোই কিন্তু মাঝখান দিয়ে কি থেকে কি হয়ে গেল !
আমাদের এলাকার সবাই জানে বিয়ে করতে যাচ্ছি । এখন যদি বউ ছাড়া এলাকাতে ফিরে যাই তাহলে আব্বার মান সম্মান কোথায় যাবে ? এটার জন্যই আব্বার সব থেকে বেশি চিন্তা। সবাই তো আব্বাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে তখন ! তিনি কি মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারবেন ? আমি আর কিছু ভাবতে পারলাম না !
বড় মামা এগিয়ে এসে বললেন,
-এখন কি করবেন দুলাভাই ?
আব্বা একবার আমার দিকে, আরেকবার বড় মামার দিকে তাকালেন ! বড় মামা বললেন,
-ওদেরকে ফোন করে জানিয়ে দেন । কি আর করা ! কিছু তো করার নেই !
আব্বা কিছু সময় শূন্য দৃষ্টিতে তাকাতে রইলেন এদিক ওদিক । তার বিশ্বাস জন্মেছে যে ভাইয়া বুঝি এখনই চলে আসবে তার সামনে । এসে বলবে চল আব্বা বিয়ে করা যাক ! কিন্তু সে সবের কিছুই হল না !
আব্বা দুর্বল হাতে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডায়েল করলেন । আমাকে রেখে একটু সামনে এগিয়ে গেলেন । কি কথা বললেন সেটা আমি শুনতে পেলাম না । একটু পরে যখন যখন ফোনে কথা বলা শেষ হল তখন আমার দিকে আবার ফিরে এলেন । বড় মামা বললেন,
-কি বলল ওরা ?
-রফিক সাহেব আসছেন ! আমাদের এখানে অপেক্ষা করতে বলেছেন !
|
|
চলবে....??
