গল্পঃ ডিয়ার হোম মিনিষ্টার | পর্বঃ (৫)

 

আমি কত সময় অজ্ঞান ছিলাম আমি জানি না । চোখ খোলার কিছু সময় পর্যন্ত আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না যে আমি আসলে কোথায় আছি । কয়েক মুহুর্ত লাগলো আমার সব কিছু মনে করতে । সব মনে করার সাথে সাথেই আমি সোজা হয়ে বসলাম । ঘরের চারদিকে তাকাতে শুরু করলাম । ভাল করে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম চারিদিকে ।


ঘরটা অন্ধকার নয় । আবার একেবারে উজ্জল আলোতে আলোকিতও নয় । তবে সব কিছু একেবারে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে । আমি একটা একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে উপর বসে আছি । আমাকে বেঁধে রাখা হয় নি । ঘরে কোন জানালা নেই । একটা মাত্র দরজা আছে । সেই দরজা দিয়ে কিছু মানুষের কথা বলার আওয়াজ ভেসে আসছে । তারা পাশের ঘরে বসে গল্প করছে সেটা বুঝতে কষ্ট হল না ।


আমি একটু মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবতে শুরু করলাম ।


সকালবেলা আমাকে যখন ওরা ধরেছিলো একজন আমাকে বলেছিলো তারা পুলিশের লোক । যদি তারা পুলিশের লোক হয়ে থাকে তাহলে আমাকে ওভাবে অজ্ঞান করার দরকার ছিল কেন তাদের ! তার উপর আমাকে তো কোন থানাতে নিয়ে যাওয়ার কথা । কিংবা ডিবির কার্যালয়ে ! কিন্তু আসে পাশে তাকিয়ে আমার তো মনে হচ্ছে না যে এটা কোন পুলিশ স্টেশন !


তাহলে আমাকে এখানে কেন নিয়ে আসা হয়েছে ?


ঘরের চারিদিকে আমি দেখতে শুরু করলাম ! কোন ভাবেই পালানোর কোন পথ নেই । একটা মাত্র দরজা দেখা যাচ্ছে । আচ্ছা কোন ভাবে যদি দৌড় দেই দরজা দিয়ে বের হয়েই তাহলে কি কাজ হবে ?


কোন দিকে তাকানো যাবে না । সামনে যাকে পাওয়া যাবে তাকেই ধাক্কা দিয়ে বের হয়ে যাবো !


তবে চিন্তাটা বেশি ধরে রাখতে পারলাম না । কারন আমি জানি তাতে কাজ হবে না । দেখা যাবে যে ঘরে যে দরজা আছে সেটা আগে থেকেই বন্ধ করা আছে । আমার বের হওয়ার কোন উপায় নেই ।


আমি ঘরের চারিদিকে আরও ভাল করে তাকালাম । নাহ এমন কিছু এখনও চোখে পড়ছে না যেটা আমার কাজে আমাকে সাহায্য করতে পারবে ! আচ্ছা এখন কয়টা বাজে ?


কথাটা মনে হতেই আমি পকেটে হাত দিলাম !


নাহ ! মোবাইলটা নেই । কোন অনুষ্ঠান ছাড়া হাতে আমি খুব একটা ঘড়ি পরি না । ঘরের দেওয়ালে কোন ঘড়িও নেই ।


বাইরে কি এখন অন্ধকার ?


তখনই আমি বাইরে আওয়াজ পেলাম । কেউ একজন এসেছে ! বাইরের ঘরের লোক গুলো সব দাড়িয়ে গেছে । অন্তত চেয়ার টানার শব্দ শুনে আমার তাই মনে হল ! আমার ধারনা কে সঠিক প্রমানিত করতেই জায়েদ আমানকে আমি ঘরে ঢুকতে দেখলাম ! তার পেছনে আরও কয়েকজন ঘরে ঢুকলো !


জায়েদ আমান দেখবে বেশ সুপুরুষ ! বেশির ভাগ সময়ে সাদা পাঞ্জাবী পরে থাকে, সেই সাথে মুখে একটা হাসি লেগে থাকে সব সময়ে । এই জন্য দেখতে আরও বেশি চমৎকার লাগে তাকে । আমার দিকে চোখ পড়তেই তার মুখে একটা বিস্তৃত হাসি দেখতে পেলাম ।


আমার সামনে এসে দাড়ালো !


তারপর হাসি মুখেই বলল, লেখক সাহেবের দেখি ঘুম ভেঙ্গেছে !


আমি কিছু বললাম না । আমার কিছু বলার জন্য সে কথাটা বলে নি । একজন একটা চেয়ার এনে দিল । সে বসে পড়লো আমার মুখোমুখী । আমি কিছু সময় তার দিকে তাকিয়ে রইলাম । এখনও পর্যন্ত আমার সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করে নি । আমার গায়ে কেউ হাতও দেয় নি । তবে আমি যদি উল্টাপাল্টা কিছু করি তাহলে সেটা করতে তারা মোটেই দ্বিধা করবে না সেটা বুঝতে আমার কষ্ট হল না ।


জায়েদ আমান বেশ কিছু সময় চুপ থেকে বলল, দয়া করে ব্যাপারটা পারসোনালী নিবেন না । আসলে আপনার সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই । ইভেন ছোট বোন আপনার লেখা খুব পছন্দ করে । আমাকে অনেক দিন বলেছে আপনাকে যেন বাসায় দাওয়াত দেই । কিন্তু বুঝতেই পারছেন আপনার ওয়াইফের সাথে আমার একটা যুদ্ধ চলছে ।


আমি কোন কথা বললাম না ।


জায়েদ আমান আবার বলা শুরু করলো, আমি আপনার কেসটা দেখেছি । আপনাকে যদি এখন কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয় বিশ্বাস করেন আপনাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না । ফাঁসি না হলেও যাবজ্জীবন হবেই । আমি নিজে কেসটা ভাল করে দেখেছি ।


আমি বললাম, আমি নওরিনকে মারি নি ।


জায়েদ আমান বলল, আমি সেটা জানি । আপনার মত মানুষ কাউকে খুন করতে পারে এটা আসলে বিশ্বাস করা কঠিন । কিন্তু প্রমান সেটা বলে না । যে আপনাকে এই পরিস্থিতিতে ফেলেছে সে নিশ্চিত ভাবেই বেশ বুদ্ধি করেই ফেলেছে । যাই সেটা আমার চিন্তার ব্যাপার না ।


আমি বললাম, তাহলে আপনার কি চিন্তার ব্যাপার ? আমার মনে হচ্ছে না যে আপনি আমাকে পুলিশে হ্যান্ডওভার করবেন !


জায়েদ আমান হাসলো । তারপর বলল, ঠিকই ধরেছেন । আসলে আপনি ফাঁসিতে ঝুলেন কিংবা জেলে যান তাতে আমার কিছু যায় আসে না । আগেই বলেছি আপনার সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই । কিন্তু আপনার বউয়ের সাথে আছে । আপনাকে যদি আমি পুলশের কাছে হ্যান্ডওভার করে দেই, আমি খুব ভাল করেই জানি যে বিচার কার্যে আপনার বউ কোন দিন ইন্টারফিয়ার করবে না । আপনার ফাঁসি হয়ে গেলেও না । তাকে আমি খুব ভাল করে চিনি !


দুঃখের ব্যাপার এই ব্যাপারটা আমি নিজেও জানি । নিকিতা কোন বিচারক কিংবা আইনের উপর নিজের প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে নি । সে করবেও না । এমন কি আমার জন্যও না । আর সত্যিই যদি সে বিশ্বাস করে থাকে যে নওরিনকে আমি মেরেছি তাহলে তো আরও করবে না । জায়েদ আমান বলল, সি এটাই হবে । তখন কি হবে জানেন তখন আপনার বউকে মানুষ আরও বেশি পছন্দ করতে শুরু করবে ! সবাই বলবে দেখো আমাদের হোম মিনিস্টার কতখানি সৎ! নিজের অপরাধী স্বামীকেও ছাড় দেয় নি ! কিন্তু আমি এটা চাই না । প্রথমও আমি চাই আপনি কোন দিন ধরা না পড়েন । তাহলে সবার মনে একটা সন্দেহ জাগবে যে কেন খুনী ধরা পরছে না । এবং এক সময় সেটা সবার মনে বিশ্বাসে পরিনত হবে । সবাই ভাববে যে নিজের স্বামীকে সে সে রক্ষা করছে । দ্বিতীয় আমি আপনার বউ কঠিন ভাবে আঘাত করতে চাই । এতোদিন সে আমাকে যা যা দিয়েছে সেটা ফেরৎ দিতে চাই সুদ সমেত !


আমি জায়েদ আমানের কথাটা বুঝতে পারলাম না । সে আসলে কি করতে চাচ্ছে ।


জায়েদ আমান বলল, আর এই দেশে কাউকে খুনে না পাওয়ার সব থেকে সহজ উপায় হচ্ছে যে তাকে মেরে ফেলা !


লাইনটা জায়েদ আমান এতো সহজে বলল যেন সে দোকান থেকে চিপ্স কেনার কথা বলছে । আমি খানিকটা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাম । তারপর কোন মতে বলার চেষ্টা করলাম, নিকিতা ঠিকই জানতে পারবে !


জায়েদ আমান হাসলো । তারপর বলল, আমি জানি । এবং আমি এটাই চাই । আমি চাই সে জানুক কাজটা আমি করেছি কিন্তু লিগ্যালি সে কিছু করতে পারবে না । সব সময় জানবে তার প্রিয় মানুষটার খুনী তার চোখের সামনেই আছে কিন্তু সে কিছু করতে পারছে না ! হা হা হা ! এর থেকে বড় প্রতিশোধ আর কি হতে পারে !


জায়েদ আমান আর বসলো না । ঘর থেকে বের হয়ে গেল । আমি মুর্তির মত বসে রইলাম । এর আগেও এই রকম পরিস্থির স্বীকার হয়েছি কিন্তু আজকে কেন জানি আমার খুব ভয় করতে লাগলো ।


এরপরেই কিছু সময় পরেই আমার ঘরে আবার ওরা ফিরে এল । আমাকে উঠতে ইশারা করলো । আমি কোন বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম না । জানি বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই । আমি আস্তে আস্তে হাটা শুরু করলাম । আমাকে আবারও গাড়িতে তোলা হল । আমি যখন বাইরে বের হয়ে এসেছি তখন বাইরে রাত হয়ে গেছে । কয়টা বাজে আমি ঠিক জানি না তবে বেশ রাতই মনে হল । কারন আসে পাশে মানুষজন নেই বললেই চলে । তার মানে আমি অনেকটা সময় অজ্ঞান ছিলাম ।


ওরা আমাকে একটা গাছ গাছালির মত স্থানে নিয়ে এল । এরপর আমাকে গাড়ি থেকে বের করে বাইরে দাড় করালো । ওরা দাড়ালো পেছনে । পেছন থেকে একজন বলল, যা বেটা একটা সুযোগ দিলাম । পালাতে পারলে পালা !


আমি জানি আমি পালাতে পারবো না । আমি দৌড়াতে শুরু করলেই ওরা আমাকে গুলি করবে । আমি আবারও মূর্তির মত দাড়িয়ে রইলাম ! আমি জানি দাড়িয়ে থাকলেও কোন লাভ হবে না । একটা সময় ওরা ঠিকই গুলি করে দিবে !


আমি চুপ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম । কয়েক সেকেন্ডও যেন আমার কাছে মনে হল কয়েক বছর ! তখনই পিস্তলের সেফটি লক খোলার আওয়াজ পেলাম ! ভাবার জন্য হয়তো শেষ কয়েক সেকেন্ড পেলাম হাতে ! একেবারে শেষ মুহুর্তে আমার নিকিতার কথা মনে হল। মরে যাই মনে দুঃখ নেই যদি একটা বার নিকিতাকে বলতে পারতাম যে আমি কাউকে খুন করি নি, অন্য মেয়ের জন্য তোমাকে ধোকা দেই নি তাহলে হয়তো মনের ভেতরে শান্তি লাগতো । একটা আফসোস নিয়ে মরতে হত না !


তারপরই গুলির শব্দ হল !

|

|

চলবে....??

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url