গল্পঃ ডিয়ার হোম মিনিষ্টার | পর্বঃ (৪)

 

আমাদের দেশের পুরুষেরা একজন পুরুষের কাছে পরাজিত হয়ে নিজের হারটা স্বীকার করে নিতে পারে । ধীরে ধীরে সেই পরাজয়ের কষ্টটা মেনে নিতে পারে কিন্তু যখন একজন পুরুষ একজন নারীর কাছে পরাজিত হয় তখন সেটা সে একদম মেনে নিতে পারে না । সময়ের সাথে সেই ক্ষত শুকায় না বরং দিন দিন আরও বৃদ্ধি পায় !


জায়েদ আমানের ব্যাপারটাও ঠিক একই রকম । নিকিতার বাবা আর জায়েদ আমানের বাবা একই সাথে রাজনীতিতে এসেছিলো । জায়েদ যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকে তার উদ্দেশ্য ছিল সে একদিন বাবার স্থান নেব । হয়তো সে নিয়েই নিত । তবে মাঝখান দিয়ে নিকিতা ঝামেলা পাকিয়ে দিল । ও সেই স্কুল জীবন থেকে শুরু করে সেই রাজনীতির সাথে যুক্ত । স্কুল কলেজ এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ছাত্ররাজনীতি করে এসেছে । দলের জন্য তার আন্তরিকতার অন্ত ছিল না ।


সেদিক দিয়ে নিকিতা এসবের মাঝে ছিল না । সে মন দিয়ে পড়াশুনা করেছে । তারপর সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছে । কিন্তু তারপর নিকিতা এসেছে রাজনীতিতে ।


কিন্তু পুরো দেশের মানুষ নিকিতার উপর এমন ভাবে ফোকাস করা শুরু করেছে যে জায়েদ আমানের কথা যেন সবাই ভুলেই গেল । এমন কি ওদের রাজনৈতিক দলের নেতারাও নিকিতাকে বেশি যোগ্য মনে করলো । যে পদটা জায়েদের পাওয়ার কথা ছিল নিকিতা সেটা দখল করে ফেলল । এবং কোন সন্দেহ নেই যে নিকিতা নিজের দায়িত্ব খুব ভাল ভাবেই পালন করছে । তারপরেও জায়েদ এটা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছে না ।


প্রতিটা ক্ষেত্রেই জায়েদ নিকিতার কাছে হেরে যেতে লাগলো । যেখানে ও একজন পূর্ন মন্ত্রী জায়েদ কেবল একজন প্রতিমন্ত্রী । জায়েদ সরাসরি কিছু বলতে না পারলেও সে যে নিকিতাকে ঘৃণা করে সেটা কারো অজানা নয় । এখন সে নিকিতাকে বাগে আনার একটা সুযোগ পেয়েছে । সেটা সে কোন ভাবেই হাত ছাড়া করবে না । নিকিতা মাঝে মাঝেই আমাকে এই জায়েদ আমানের কথা বলতো । অন্য দলের মানুষ হলে নিকিতা তাকে ঠিকই দেখে নিতো । কিন্তু ওরা একই দলের হয়ে কাজ করছে । এমন কি স্বয়ং প্রাইম মিনিস্টার ওদের দুজনকে বলে দিয়েছে যেন ওরা কোন ভাবেই যেন একে অন্যের পেছনে না লাগে ।


কিন্তু এখন এই জায়েদ আমানের হাতে একটা সুযোগ এসেছে নিকিতাকে কঠিন ভাবে আঘাত করাার । আমাকে ধরতে পারলেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে তার জন্য ।


দুইটা দিন আমি এই বাসাতেই বসে রইলাম । এর মাঝে একটা বারের জন্যও আমি মোবাইল চালু করি নি । আমার মোবাইল খোলার অপেক্ষা করছে ওরা । হৃদি যে মোবাইলটা দিয়ে গেছে সেটা নিয়েই কাজ করছি । ফেসবুক আর ফ্যান পেইজটা বন্ধ করে দিয়েছি অনেক আগেই । এখন একটা অন্য আইডি খুলে মানুষের মন্তব্য পড়ার চেষ্টা করছি ।


মোটামুটি সবাই ভেবে নিয়েছে যে আমি খুনটা করেছি । তাদের থিউরি হচ্ছে আমার সাথে নওরিন আফরোজের একটা পরকীয়া সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল । গোপনে সেটা চলছিলো বেশ ভাল ভাবেই । আমরা মাঝে মধ্যে সুযোগ পেলেই এরমন রিসোর্টে গিয়ে হাজির হতাম । এইবারও তেমন ভাবেই গিয়ে হাাজির হয়েছিলাম । তারপর কোন একটা ঝামেলার কারনে আমি তাকে খুন করে চলে আসি । কারন হিসাবে তারা ধরে নিয়েছে নওরিন হয়তো আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলো । আমী তাতে রাজি হয়ই । আপাতত এটাই সব থেকে উল্লেখযোগ্য কারন ।


আবার আরেকদল আছে তারা কারন হিসাবে মদ খাওয়াকে দেখছে । তাদের ভাস্যমতে মি অতিরিক্ত মদ খেয়ে ফেলেছিলাম । তাই আমার মাথা ঠিক ছিল না । কি করতে কি করে ফেলেছি কে জানে ।


অতি অল্প কয়েক জনকে দেখলাম তারা আসলে এখনও বিশ্বাস করে যে আমি কি করি নি । আমি কাউকে খুন করতে পারি না । আমাকে ফাঁসানো হয়েছে । মনে হল যাক অন্তত কিছু মানুষ এখনও অন্তত আমার উপর বিশ্বাস রাখে । নিকিতা কি আমাকে বিশ্বাস করে?


কই একবারও তো ও বলল না যে আমি কোন ভাবেই খুন করতে পারি না । আচ্ছা ও কি একবারও আমাকে ফোন করার চেষ্টা করেছে । আমি আমার কৌতুহল আর ধরে রাখতে পারলাম না । গত দুইদিনে মোবাইলটা সব সময় বন্ধ রেখেছলাম । এবার ঠিক করলাম যে মোবাইলটা চালু করবো । একটু পরেই এখান থেকে চলে যাবো । হৃদি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে । মেয়েটা এতো কিছু কিভাবে করলো কে জানে । ঠিক হয়েছে এখান থেকে সোজা আমরা বাঙ্গলাবান্ধা যাবো । সেখান থেকে আমরা ভারতে ঢুকবো । আমার চোহারা একটু পরিবর্তন করতে হবে । সেটার জন্য আমাকে পথের মাঝে এক স্থানে থামতে হবে ।


আমি মোবাইলটা চালু করলাম । মোবাইলে মিসকল এলার্ট সেট করা ছিল । সেটার কয়েকটা মেসেজ এল । এই দুইদিনে আমাকে যারা ফোন দিয়েছে তাদের একটা লিস্ট । এর ভেতরে মায়ের নাম্বারটাই বেশ কয়েকবার দেখতে পেলাম । আরও পরিচিত কয়েকজন বন্ধুবান্ধকেও দেখতে পেলাম যারা ফোন দিয়েছে । কিন্তু নিকিতার নাম্বার দেখতে পেলাম না একবারও ।


ওর কয়েকটা গোপন নাম্বার আছে । সেগুলো সবই আমি জানি । কিন্তু সেগুলোর একটা থেকেও আমার নাম্বারে একটা ফোনও আসে নি ।


তাহলে কি নিকিতা সত্যিই সত্যিই ধরে নিয়েছে যে আমি খুন করেছি ! নয়তো একবারও আমার খোজ নিবে না ?


মনটা খারাপ হল । মাকে ফোন দেওয়া মোটেও উচিৎ হবে না জেনেও ফোন দিয়ে ফেললাম । আমি জানি মায়ের মোবাইল ট্যাপ করা হচ্ছে । কিংবা এমনও হতে পারে যে এখন আমাদের ফ্ল্যাটেই পুলিশ অবস্থান করছে ।


ফোন করার সাথে সাথেই মা ফোন রিসিভ করলো । আমার কাছে মনে হল মা যেন ফোন হাতে নিয়েই বসে ছিল । প্রথমে কিছু সময় কথাই বলতে পারলো না । কান্না কাটি করতে লাগলো । মায়ের কান্না একটু থামতেই আমি বললাম, আমি সত্যিই কাউকে খুন করি নি মা ।


মা বলল, আমি জানি আমার ছেলে কেমন । তুই কাউকে মারতে পারিস না ! যেদিন থেকে তোর সাথে ঐ মেয়ের বিয়ে হয়েছে সেদিন থেকে তোর জীবনে ঝামেলার শেষ নেই ।


নিকিতার সাথে বিয়েটা মা আসলে কোন দিনই মেনে নিতে পারে নি ঠিক মত । তার কাছে দেশের রাজনীতিটা একটা বিষাক্ত জিনিস ছাড়া আর কিছুই নয় । তবে আমার পছন্দের কাছে মা আর কিছু বলেন নি । বাইরে প্রকাশ না করলেও মনে মনে সে যে নিকিতাকে ঠিক পছন্দ করেন না সেটা বুঝতে আমার আসলে অসুবিধা হয় না । আমি বললাম, মা এখন আমাকে ফোন রাখতে হবে । আমি ভাল আছি । চিন্তা কর না ।


আর কিছু বলার আগেই আমি ফোন কেটে দিলাম । আমি জানি আমার ফোন ট্রাক করার চেষ্টা করা হয়েছে । জানিন সফল হয়ে গেছে কি না ।


একটু পরেই হৃদিকে ঘরে ঢুকতে দেখলাম । ও বলল, চল যাওয়ার সময় হয়েছে । আমার হাতে আমার পাসপোর্ট টা ধরিয়ে দিল । আমি পাসপোর্ট হাতে নিয়ে দেখলাম সেখানে লেখা আবির চট্টোবাধ্যায় নাম ঠিক করা হয়েছে আমার জন্য । সেই সাথে একটা কাগজ হাতে দিল । সেখানে আবির সম্পর্কে কিছু তথ্য । আমি সেগুলো মনে গেধে নেওয়ার চেষ্টা করলাম ! আধা ঘন্টা পরেই আমরা রওনা দিয়ে দিলাম ।


হৃদিকে যতই দেখছি আমি ততই অবাক হচ্ছি । মেয়েটা সত্যি অনেক বদলে গেছে ! এমন তো ও ছিল না কোন কালেই । তাহলে এই পরিবর্তনটা কেন হল ? অবশ্য বাইরে থাকলে মানুষের মাঝে পরিবর্তন আসবেই । হৃদির তাই হয়েছে ।


আমরা আবারও ঢাকার দিকে ছুটে গেলাম । আলাদা করে গাড়িতে করে কিংবা বাসে যাওয়ার সাহস হল না । কারন রাস্তার মাঝে বাস আর গাড়ি প্রায়ই চেক হয় । ট্রেনে করে যাওয়া সব থেকে বেশি নিরাপদ ।


পথের মাঝে আমরা একটা বাসায় থামলাম । সেখান থেকে যখন বের হলাম তখন আমি নিজেকে নিজেই ঠিক মত চিনতে পারছি না । মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরাতে বেশ কিছু সময় নিজেকে চেনার চেষ্টা করতে লাগলাম । কিন্তু সত্যি বলছি ঠিক চিনতে পারছিলাম না ।


হৃদির দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমাকে কেমন যেন মনে হচ্ছে ? এসব কিছু কিভাবে জানো ?


হৃদি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আর আগের সেই মানুষটা নেই অপু । অনেক বদলে গেছি । বলতে পারো তোমার বউ আমার জীবনটা বদলে দিয়েছে । তোমার কাছ থেকে আমি লুকাবো না । আমি একটা আন্তর্জাতিক রিসার্স সেন্টারের সাথে যুক্ত হয়েছি । এবং ....


এই লাইন টুকু বলে হৃদি একটু থামলো । কিছু যেন ভাবছে । আমাকে সবটা বলবে কি না সেটা আরেকবার ভেবে নিচ্ছে । আমি বললাম


-এবং ?


-এবং সেই সেন্টারটা কেবল এই রিসার্সই করে না আরও অনেক কিছু করে ।


-আরও অনেক কিছু বলতে ?


-আছে অনেক কিছু । আমাদের ফান্ডিংয়ের একটা ব্যাপার আছে । নানান স্থান থেকে ফান্ডিং আসে । সেই ডোনারদের জন্য আমাদের কিছু করতে হয় । আমাদের নানান দিকে লিংক থাকে । এই জন্য আমি এতো কিছু জানি । এতো কিছু করতে পারছি ।


আমি আর কি বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না । আমি আর কিছু জানতেও চাইলাম না । ঢাকায় এসেই আমরা আলাদা হয়ে গেলাম । হৃদি আমার সাথে আপাতত যাবে না । ও প্লেনে করে যাবে এবং ইন্ডিয়াতে গিয়ে আমাকে সে রিসিভ করবে ।


সব কিছু ঠিক থাকলে কাল সকাল দশটার ভেতরে আমি এই দেশ থেকে বেরিয়ে যাবো ।


নতুন মোবাইলটা নিয়ে আমি নিকিতার কথা ভাবতে লাগলাম । মেয়েটা এখন কি ছুটিতে চলে গেছে । দেশে আসে নি সে । দেশে আসলে খবরে বের হত । আচ্ছা শান্তিমত ঘুমাতে পারছে তো ! নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারটা কি আমার থেকে বড় ?


হ্যা বড় ! এটা আমি আগে থেকেই জানি । নিকিতার কাছে সত্যিই সবার আগে ওর রাজনীতি তারপর অন্য কিছু ।


মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম । আমার এই ফেরারী জীবন কতদিন চলবে কে জানে ! হয়তো আর কোন দিন দেশেই আসতে পারবো না । কাল সকালেই দেশের বাইরে চলে যাবো । এমন একটা অপরাধের জন্য আমাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হচ্ছে যেটা আমি করি নি । এবং আমার সব থেকে ভরশার মানুষটা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে । আমাকে একা রেখে চলে গেছে ।


কিন্তু সব কিছু প্লান মত হল না । যখন আমি পঞ্চগড় রেলস্টেশনে নামলাম তখনই ধরা পড়ে গেলাম । আমার জন্য ওরা অপেক্ষা করছিলো স্টেশনে !


স্টেশন থেকে বের হতেই চারজন আমাকে ঘিরে ধরলো । ওরা সাদা পোশাকে ছিল । সাথে সাথেই একটা সাদা গাড়ি এসে হাজির হল সামনে । আমি কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল । তারপর একটা রুমাল চেপে ধরলো আমার নাকের মধ্যে !


ক্লোরোফর্ম !


জ্ঞান হারানোর আগে আমার হৃদির কথা মনে পড়লো । মেয়েটা আমার জন্য বর্ডারের অপাশে অপেক্ষা করে থাকবে !

|

|

চলবে....?

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url