গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (১)

 


মানুষের ভীড় আমার কোনদিন ভাল লাগে নি । মানুষজন মানে আমার কাছে কেবল ঝামেলা মনে হয়েছে । এই পৃথিবীর যত রকম ঝামেলা শুরু হয় তার বেশিরভাগই শুরু হয় যখন কোন স্থানে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মানুষ এসে জমা হয় ।


আমি সারাজীবন চেষ্টা করেছি এই ভীড়-ভাট্টা এড়িয়ে চলার জন্য । কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনভাবেই ভীড় এড়ানো যায় না । সোজাসুজি মানুষ গুলোর ভেতরে গিয়ে পড়তে হয় । আজকে ঠিক তেমনই একটা স্থানে গিয়ে পড়তে যাচ্ছি । যেতে হচ্ছে । না গিয়ে উপায় নেই । নিজের বড় ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা । আমি যদি এই বিয়েতে না যাই আমার আব্বা আমাকে ঘাড় ধরে বাসা থেকে বের করে দিবে । আপাতত বাসা থেকে বের হওয়ার কোন ইচ্ছে আমার নেই । তাই যাচ্ছি ভাইয়ার বিয়েতে ।


আমাদের গাড়িটা বেশ দ্রুত এগিয়ে চলছে । ভাইয়ার বিয়ের জন্য বেশ কিছু গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে । তবে যে গাড়িটা বর-বউয়ের জন্য ঠিক করা হয়েছে সেটা আমাদের নিজেদের গাড়ি। বাবা নিজের কাজে এটা ব্যবহার করে । আমরা যখন ঢাকা থেকে বাসায় আসি তখন এটাতে করে ঘুরে বেড়াই । ড্রাইভার যদিও নতুন । নাম মনজুর । বয়স কম হলেও গাড়ি চালানোর হাত বেশ ভাল । বেশ জোরেই টানতে পারে ।


গাড়িতে উঠেই ভাইয়া মনজুর দিকে তাকিয়ে বলল,


-মনজুর ?


-জি ভাইজান ?


-গাড়ি চালাবে ঝড়ের বেগে ।


আমি খানিকটা অবাক হলাম এই কথা শুনে । ভাইয়া সব সময় শান্ত স্বভাবের ছেলে। গাড়িতে স্পীড তোলা তার পছন্দ না । আগে যখন বাসায় আসতো, আমি যদি একটু গাড়িতে গতি বাড়াতাম, তাহলেই ভাইয়া কেমন চিৎকার চেঁচামিচি করতো, বারবার গাড়ির গতি কমাতে বলতো । আর আজকে সে-ই কি না নিজ থেকে বলছে গতি বাড়াতে !


বিয়ে করার জন্য তর সইছে না সম্ভবত !


মনজুর আমার মনের ভাবটা বুঝতে পেরে হাসলো খানিকটা । তবে তখন সে কিছুই বলে নি । বরের গাড়িতে ভাইয়া কেবল আমাকে উঠতে দিল । আরও কয়েকজন উঠতে চেয়েছিলো কিন্তু ভাইয়া কাউকেই নিলো না । বলল যে পেছনের গাড়িতে আসতে । আমাকে আর ভাইয়াকে নিয়ে মনজুর গাড়ি টান দিল । হাইওয়েতে উঠে গাড়ি যেন উড়ে চলল । আমি অবশ্য আর কিছু ভাবছিলাম না । আমার মনে কেবল একটাই চিন্তা ছিল যে এতো মানুষের মাঝে আমি কিভাবে সময় কাটাবো ? ভাইয়ার সাথে স্টেজে বসে থাকা আমার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব না । সবগুলো মানুষের চোখে থাকবে স্টেজের দিকে । তারা ভাইয়ার সাথে সাথে আমার দিকেও তাকিয়ে থাকবে ! এটা আমি ভাবতেই পারি না ।


আমি আজও ঠিক বুঝতে পারি না বরকে এভাবে কেন স্টেজে সবার সামনে বসে থাকতে হবে ? আমার কাছে বরের এই স্টেজে বসে থাকাটা অনেকটা গরু ছাগলের হাটের মত মনে হয় । না, ঠিক গরু ছাগলের হাট না, হাট থেকে যখন গরু ছাগল কিনে আনা হয় কুরবানীর জন্য তখন সেই গরু ছাগলের যে অবস্থা হয়, ঠিক তেমনটাই মনে হয় । পথ দিয়ে যাওয়ার সময় কিংবা গরুটাকে বেঁধে রাখার সময় মানুষজন যেভাবে গরুটাকে দেখে, স্টেজের বরকে আমার ঠিক সেই একই রকম মনে হয় ! মানুষ বরকে দেখে বলে বরের গায়ের রংটা ভাল না, আরেকটু লম্বা হলে ভাল হত, স্বাস্থ্য এতো কম কেন, এতো ভুড়ি কেন, আরও কত কিছু !


-আমি এই বিয়ে করবো না !


আমি মোবাইলের দিকে তাকিয়ে এই সবকিছুই ভাবছিলাম তখনই ভাইয়া এই কথাটা বলল । প্রথমে ভাইয়ার বলা কথাটা আমি ঠিকমত শুনতে পাই নি । ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম,


-কি বললে ? কি করবে না ?


ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল,


-আমি এই বিয়ে করবো না ।


ছোটবেলা থেকে ভাইয়াকে দেখে আসছি এমন । আব্বার প্রতিটা ব্যাপারে সে প্রথমে খুব না না করবে । আবার সবার আগে রাজী সে-ই হবে । এই বিয়ের কথাটাই ধরা যাক ! ভাইয়ার যে বিয়ে আমরা সেটা এক সপ্তাহ আগেও জানতাম না । গত সপ্তাহে আব্বা বাসায় এসে জানালো যে সামনের শুক্রবার ভাইয়ার বিয়ে । আম্মা তো একেবারেই রাজি ছিল না । আমাকে ফোন করে কত কথা বলল । সে কিছুতেই এই বিয়ে হতে দিবে না । তার কথা ছিল বড় ছেলের বিয়ে এভাবে হয় নাকি? দেখলাম না, জানলাম না আর বিয়ে !


কিন্তু আব্বা মুখ দিয়ে যা একবার যা বলবে তাই । তার কথার কোন নড়চড় হতে পারে না ।


ভাইয়ার কাছেও খবর ঠিকই পৌঁছে গিয়েছিলো । সে ঢাকাতে থাকা অবস্থায়ই আমার সাথে দেখা করে চিৎকার চেঁচামিচি শুরু করে দিল । আমি অবশ্য কেবল হু হা করে গেলাম । কারন আমি জানি আমার নিজের বড় ভাইয়ের দৌড় কত দূর ! আব্বার কথার উপর কথা বলার সাহস তার নেই ।


ইন্টারমিডিয়েট পাশের পরে ভাইয়ার অনেক ইচ্ছে ছিল লইয়ার হওয়ার । আইন নিয়ে পড়ে ব্যারিস্টার হবে । কিন্তু আব্বার ইচ্ছে ছিল তাকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবে । আব্বা বলে দিয়েছিলো যে তাকে অবশ্যই বুয়েটে চান্স পেতে হবে । আমি তাকে পরামর্শ দিলাম যে তুমি ঢাকায় গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং এ ভর্তি হও আর সাথে সাথে ল' এর জন্যও প্রিপারেশন নাও । এখন তুমি যদি বুয়েটে চান্স না পাও তাহলে তো আর আব্বা তোমাকে জোর করে পড়াতে পারবে না, তাই না । কিন্তু ভাইয়া তখন ভয়ে অস্থির । আব্বা তাকে বলেছে বুয়েটে চান্স পেতে হবে তার মানে হচ্ছে তাকে পেতেই হবে । এর উপরে আর কোন কথা নাই । দেখা গেল সে ঠিকঠিকই বুয়েটে চান্স পেয়ে গেল ! আব্বার ভয়ে তাই আর তার ব্যারিস্টার হওয়া হল না । আব্বার কথার বাইরে যাওয়া যে তার পক্ষে সম্ভব না এটা আমি খুব ভাল করেই জানি !


বিয়ে ঠিক হওয়ার দুইদিন পরে আমাকে ঢাকা থেকে ডেকে আনা হল । কাজকর্ম দেখাশুনার জন্য ! আর ভাইয়াকে ডেকে আনা হল বিয়ের দুইদিন আগে ।


আমাদের গাড়িটা এগিয়ে চলছে কনের বাড়ির দিকে । কনের বাসা আমাদের পাশের জেলাতে। আমাদের বাসা থেকে সেখানে যেতে ঘন্টাখানেক সময় লাগার কথা । আজকে শুক্রবার । ছুটির দিন হওয়ার কারনে আরও একটু কম সময় লাগবে । আমাদের পেছনে আরও বেশ কিছু গাড়ি আসার কথা তবে আপাতত সেগুলোকে দেখা যাচ্ছে না । আমাদের গাড়িটা সবার আগে রওয়ানা দিয়েছে আর চলছেও বেশ দ্রুত ।


ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,


-আমার পক্ষে এই বিয়ে করা একেবারেই সম্ভব না !


আমি বললাম,


-বিয়ে করবে না তো আব্বাকে বলতা ?


-আব্বা আমার কথা শুনতো বলে তোর মনে হয় ?


-তাহলে এখন কেন বলছো ? এখন সে শুনবে ? শুনো, এই সব চিন্তা বাদ দিয়ে চুপচাপ বিয়ে করে ফেল । শুনেছি মেয়ে নাকি বেশ সুন্দরী ! আর সেই সাথে মেয়ের বাবার বেশ মালকড়িও আছে । একমাত্র মেয়ে !


ভাইয়া আমার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকালো । তারপর বলল,


-আর কোন অপ্রয়োজনীয় কথা বলবি না । বউয়ের টাকা নিয়ে আমি কি করবো ? আমার বাবা কি কম আছে !


-তাহলে সমস্যা কোথায় শুনি ? তুমি তো কোন দিন বাবার কোন কথার অবাধ্য হও নি । সে যা বলেছে সেটা তুমি শুনে গেছো, বিনা বাক্য ব্যয়ে !


ভাইয়াকে দেখলাম উদাস চোখে কিছু সময় বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে । তারপর বলল,


-আমি এখানে কবুল বলবো আর ঐদিকে সূচি দশতলা থেকে নিচে ঝাঁপ দিবে !


আমি অবাক হয়ে বললাম,


-সূচিটা আবার কে ? এর নাম তো আগে শুনি নি ।


ভাইয়া কিছু সময় আবারও উদাস হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল,


-কদিন আগে আমাদের কনভোকেশন হয়েছিলো মনে আছে ?


-হ্যা ।


-ফেসবুকে আমি একটা মেয়ের সাথে ছবি দিয়েছিলাম । দেখেছিলি ?


আমি খানিকটা মনে করার চেষ্টা করলাম । তারপর আর ঝামেলা না করে নিজেই মোবাইল বের করে ছবিটা খুঁজতে লাগলাম । খুঁজে পেতে খুব একটা সময় লাগলো না । ভাইয়ার সাথে একটা মেয়েরই ছবি রয়েছে ।


ভাইয়াকে দেখিয়ে বললাম,


-এই মেয়ে ?


-হ্যা, এই মেয়ে ! এর নাম সূচি ! আমার সাথেই পড়াশুনা শেষ করেছে । এখন আমার কলিগ!


-ভাল ! তো এই মেয়েকে বিয়ে করবে ? আব্বাকে বললেই পারতে ?


ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল,


-সেই সুযোগ আমি পেলাম কোথায় শুনি ? চাকরি পেয়েছি কতদিন হয়েছে ? মাস তিন মাত্র ! এখনও আমাদের চাকরিটাও পারমানেন্ট হয় নি । ভেবেছিলাম যে চাকরি বাকরি নিয়ে একটু থিতু হলে আমি নিজেই আব্বাকে বলবো । আমার বিশ্বাস ছিল যে আব্বা কোনভাবেই সূচিকে অপছন্দ করতে পারবে না । কিন্তু মাঝ দিয়ে আব্বা যে এমন একটা কাজ করে ফেলবে সেটা তো আমি বুঝতে পারি নি ।


আমি বললাম,


-এখন আর কি করা বল ! বেটার লাক নেক্সট টাইম !


ভাইয়া আমার দিকে এমন একটা দৃষ্টিতে তাকালো ! তবে কিছু বলল না আর । নিজের মনেই কি যেন ভাবতে লাগলো । আমিও আর বেশি কিছু ভাবলাম না ।তাছাড়া কিছু ভেবে লাভও নেই । এখানে আসলে কারোর কিছুই করার নেই । বিয়ের সব কিছু তৈরি হয়ে গেছে। বরযাত্রীও বের হয়ে গেছে । এখন কোনভাবেই বিয়ে বন্ধ করা যাবে না । এর সাথে এখন আব্বার মান সম্মান জড়িয়ে আছে । আর আমার আব্বা নিজের মান সম্মান ঠিক রাখার জন্য ভাইয়াকে কুরবানী করে দিতেও পিছপা হবে না ! ভাইয়ার জন্য আর সূচি আপার জন্য সমবেদনা জানানো ছাড়া আসলে এখন আর কিছুই করার নেই ।


হঠাৎ ভাইয়ার চিৎকারে আমি চমকে উঠলাম ! বললাম,


-কি হল ?


ভাইয়া আবারও চিৎকার করে বলে উঠলো,


-গাড়ি থামাও ! গাড়ি থামাও।


আমার মত মনজুরও খানিকটা চমকে গেছে ! কিছু বোঝার আগেই সে গাড়িতে ব্রেক কষে দিল । গাড়িটা হঠাৎ করে রাস্তার মাঝেই থেমে গেল । তারপর অবশ্য একটু সুস্থির হতে গাড়িটাকে এক পাশে নিয়ে যাওয়া হল । গাড়িটা ভালভাবে থামতেই ভাইয়া গাড়ি থেকে নেমে গেল ।


রাস্তার একপাশে বেশ বড় একটা খাল দেখা যাচ্ছে । অন্য পাশে বেশ কিছু গাছগাছালির ভীড় । আশেপাশে কোন বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে না । ভাইয়াকে দ্রুত গাছ-গাছালির ভেতরে যেতে দেখে আমার মনে হল ভাইয়ার হয়তো বাথরুম চেপেছে । সেটার জন্যই এতো তাড়াহুড়া করে সেদিকে দৌড় দিয়েছে । আমি গাড়ির ভেতরেই বসে রইলাম । নিজের মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত হয়ে রইলাম !


কিন্তু কিছু সময় চলে গেলেও যখন ভাইয়া এসে হাজির হল না তখন আমার কেন জানি সন্দেহ হল । আমার মত মনজুরও খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। আমার দিকে তাকিয়ে বলল,


-ভাই, বড় ভাইজানের এতো সময় ক্যান লাগতাছে ?


-কি জানি ! চিন্তা কর না । চলে আসবে । কিন্তু আরও মিনিট দুয়েক কাটার পরেও যখন সে এল না, তখন আমি আর বসে থাকতে পারলাম না । নিজেই গাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম । ভাইয়া যেদিকে গিয়েছিলো ঠিক সেই দিকে দৌড়ে গেলাম । খুব বেশিদূর যেতে হল না । কিছুদূর যেতেই দেখতে পেলাম একটা মাটির রাস্তা । রাস্তাটা কোন দিকে গেছে ঠিক বলতে পারলাম না ! কাউকে আশেপাশে দেখতেও পেলাম না !


ভাইয়া কোথায় ?


কি সর্বনাশের কথা !


ভাইয়া পালিয়েছে !

|

|

চলবে.....

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url