গল্পঃ ডিয়ার হোম মিনিষ্টার | পর্বঃ (৭)
এর আগেও আমি গুলির খেয়েছি ! তবে সেই গুলি খাওয়ার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতির ভেতরে একটা পার্থক্য আছে । সেই সময়ে আমি জানতাম না যে কখন গুলিটা আমার শরীরে এসে লাগবে । আমি জানতামই না যে কোন গুলি আসবে । আমি তখন অন্য কিছু করছিলাম । বলা যায় আমার জীবনের সব থেকে সুন্দর একটা সময়ের ভেতরে দিয়ে যাচ্ছিলাম । সেই সময়ে হঠাৎ করে এসে গুলিটা আমার শরীরে লাগে । কিন্তু এখন আমি জানি । আমি ঠিক ঠিক জানি যে আর কয়েক সেকেন্ড পরেই গুলিটা এসে আমার পেছনে লাগবে ।
আচ্ছা কোথায় লাগবে ?
আমি যেহেতু পেছন দিক করে আছি ওরা আমার পিঠেই গুলিটা মারবে । ঠিক স্থানে যদি লাগে তাহলে হয়তো সাথে সাথেই মারা যাবো । কিন্তু যদি এদিক ওদিক লাগে তখন কষ্ট পেয়ে মরবো ।
আমার মাঝে কি হল ঠিক জানে না । আমি আর নিজেকে স্থির ভাবে দাড় করিয়ে রাখতে পারলাম না । গুলি চালানোর ঠিক আগ মুহর্তে আমি দৌড় দিলাম ! এটা সম্ভবত ওরা আশা করে নি । আমি যেভাবে নিশ্চল হয়ে দাড়িয়ে ছিলাম, ওরা ভেবেছিলো যে আমি হয়তো এভাবেই দাড়িয়ে থাকবো । নিশ্চিত মৃত্যুকে সামনে দেখে অনেকের শরীর অবস হয়ে যায় । ওরা ভেবেই নিয়েছিল যে আমি এক স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকবো ।
আমি দৌড়ানোর সময় প্রথমেই একটু ডান দিকে বেঁকে গিয়েছি তারপর বাঁ দিকে চলে এসেছি । এটাই সম্ভবত বুদ্ধুমানের কাজ ছিল । প্রথম গুলিটা ঠিক আমার কানের পাশ দিয়ে বাতাস কেটে চলে গেল । আমি আমার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম ।
আরও একটা গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম । তবে এটাও আমার শরীরে লাগলো না ।
আর একটু দুরে । যদি কোন মতে আমি সামনে গাছ পালার ভেতরে ঢুকে যেতে পারি তাহলে হয়তো এই যাত্রায় আমি বেঁচে যেতে পারি ! এই তো চলে এসেছি । আর হয়তো কয়েক কদম !
যখন ভেবেই নিয়েছি আমি যে আমি এইবার বেঁচে গিয়েছি ঠিক সেই সময়েই গুলিটা আমার কাধে লাগলো । আমার আবারও সেই অনুভূতিটা হল । মনে হল যেন আমার শরীর দিয়ে একটা আগুন ঢুকে যাচ্ছে । আমি ছিটকে গিয়ে পড়লাম সামনে ।
কিছু সময় যেন মাথার ভেতরে সম্পূর্ক খালি হয়ে গেল । আমার মাথার ভেতরের সমস্ত নিউরন কেবল আমার ডান কাধের কাছে ব্যাথাটার কথা চিন্তা করতে লাগলো । অন্য কিছু যেন নেই পৃথিবীতে ।
কিন্তু মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য । আবারও সব চিন্তা ফেরৎ এল । পেছনের লোক গুলো এখনই এগিয়ে আসবে ।
নাহ ! তার আগেই আমাকে উঠতে হবে ! এভাবে মরে যাবো ?
না এর আগেও দুইবার আমি মৃত্যুর মখ থেকে ফেরৎ এসেছি !
মনের শক্তিটুকু এক সাথে করলাম । তারপর উঠে দাড়ালাম চট করে !
পেছন থেকে আবারও হই হই শুনতে পেলাম ! তবে আমি সেদিকে লক্ষ্য দিলাম না । আমি একেবারে গাছগাছির কাছে চলে এসেছি । আর চিন্তা না করেই আমি গাছগাছির ভেতরে ঢুকে পড়লাম । তারপর দৌড়াতে শুরু করলাম । পেছন থেকে আবারও গুলির আওয়াজ আসতে লাগলাম তবে এইবার আর খুব একটা কাজ হল না ।
আমাকে এতো সময়ে ওরা দেখতে পাচ্ছিলো কারন গাড়ির হেড লাইট জ্বালানো ছিলো । কিন্তু এই গাছগাছালির ভেতরে ঢুকে পড়াতে আমাকে ওরা দেখতে পাচ্ছে না । আমি কোন দিকে যাচ্ছি সেই সম্পর্কে ওদের কোন ধারনা নেই । আমি খানিকটা বেঁকে দৌড়াতে শুরু করলাম । সামনে কি আছে সেটা আমি দেখতে পাচ্ছি না তবে সেটা আমার এখন চিন্তার কোন বিষয় নয় । আমি প্রাণ ভয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম । কেবল মনে হতে লাগলো যে এখন আমি থামলেই আমাকে মরতে হবে !
সম্ভবত এই চিন্তার কারনে আমি এবারের মত বেঁচে গেলাম । শুনেছি মানুষ যখন মৃত্যুর সামনে পরে তখন সে অসাধ্য সাধন করতে পারে । আমি যখন প্রাণ ভয়ে অন্ধকার বনের ভেতরে দৌড়াচ্ছিলাম তখন আমি কিভাবে যেন সামনের গাছ গাছালি কিছুর অবস্থান বুঝতে পারছিলাম । দ্রুত সরে যাচ্ছিলাম । তাই মোটামুটি বন ভেদ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারছিলাম কিন্তু পেছনের মানুষ গুলোর ভেতরে এই অনুভূতিটা কাজ করছিলো না যে ওদের কেউ মারতে আসছে । সম্ভবত এই কারনেই ওরা আমাকে ধরতে পারলো না আর । কত সময় আমি দৌড়েছি সেটা আমি বলতে পারবো না তবে আমার বুঝতে অসুবিধা হল না যে আমি ওদের কাছ থেকে অনেক দুরে চলে এসেচি । ওরা আর আমাকে খুজে পাবে না ।
যখনই আমার মন বিশ্বাস করে নিল যে ওরা আর আমাকে খুজে পাবে না তখনই আমার শরীর পুরোপুরি ছেড়ে দিলো । কাধের ব্যাথাটা আবার ফিরে এল সাথে সাথে । আমার পুরো পৃথিবী যেন আবারও নড়ে উঠলো একেবারে ! আর কয়েক কদমও যেতে পারলাম না। আমার কাছে মনে হল আমার শরীরে আর কোন শক্তি অবশিষ্ট নেই । মাটিতে পড়ে গেলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই আমার ।
অল্প অল্প চেতনা ফিরে ফিরে এসেছিল মাঝে মাঝে । আমার ভাসা ভাসা কিছু মনে আছে । একবার মনে হল কেউ আমাকে কাধে তুলে নিয়েছে । আমাকে বয়ে নিয়ে চলছে । আমার শরীরে কাছ পালার মৃদু আঘাত লাগছে । তারপর একবার মনে হল আমি যেন কারো কাধে ভর দিয়ে এগিয়ে চলছি । আবার একবার মনে হল একজন নয়, দুজনের কাধে ভর দিয়ে এগিয়ে চলছি !
বিলাপের মত কি যেন বলছি । পুর সময় জুড়ে আমার কাধের ব্যাথাটা অনুভব করতে পারছিলাম পুরোপুরি । একবার মনে হল আমি যেন নিকিতাকে দেখলাম । আমাকে মাটিতে শুইয়ে রেখেছে । আমার চোখের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে !
আচ্ছা নিকিতা কি কাঁদছে ?
ওর চোখে আমি যেন কান্না দেখতে পেলাম । আমার কষ্টে ও নিজেও যেন কাঁদছে ।
এই ঘোরের ভেতরেও আমার মনে একটা শান্তি লাগলো । যাক মেয়েটা আমাকে ভালবাসে তো !
এই পৃথিবীতে একজন ভালবাসার মানুষ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার ! সবাই ভালবাসা পায় না । আমি তো পেয়েছি ।
এই রকম ভাসা ভাসা অনেক দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো ।
যখন পুরো পুরি চেতনা ফিরে এল অনুভব করলাম আমি একটা কুড়ে ঘর জাতীয় কোথাও শুয়ে আছি । ঘরটা একটু অন্ধকার মত । কোন আলো জ্বলছে না ঘরের ভেতরে । দরজা জানলা থেকে যা আলো আসছে তাতেই ঘর টাকে আলোকিত করে রেখেছে । তবে বাইরের আলো সম্ভবত কমে আসছে । এখন সম্ভব বিকাল কিংবা সন্ধ্যার সময় । একটু পরেই রাত নামবে ।
আমি কোথায় আছি ?
আমাকে যে বনের ভেতরে নিয়ে এসছিল সেটা যে কোথায় সেটা আমি জানি না । তবে কেন জানি মনে হল আমি সেই বনের কাছাকাছি কোথাও আছি ।
আমি একটু উঠে বসার চেষ্টা করলাম । তখনই ঘরে দুজন মানুষকে ঢুকতে দেখলাম । একজন বৃদ্ধ মহিলা অন্য জন তরুণী । মেয়েটার বয়স আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম । ২৮/২৯ হবে । বৃদ্ধ মহিলা আদিবাসীদের মত পোশাক পরে আছে । চেহারাতেও তার একটা উপজাতী ছাপ রয়েছে । তবে মেয়েটিকে দেখে মনে হল সে উপজাতীদের কেউ নয় । মেয়েটি একটা কালো জিন্স পরে আছে । সাথে একটা কালো টিশার্ট । মেয়েটির মুখটা কঠিন । চোখ শান্ত । আমি জেগে উঠেছি দেখেও তার চোখে কোন পরিবর্তন আসে নি । আমার দিকে শান্ত চোখেই তাকিয়ে আছে । তবে বৃদ্ধ এগিয়ে এল । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আরে উঠো না !
বৃদ্ধার কন্ঠে খানিকটা উপজাতীয় টান ।
তবে মেয়েটি কোন কথা বলল না । আমার দিকে তাকিয়ে রইলো শান্ত চোখে । বৃদ্ধ আমার কাধের ক্ষত পরীক্ষা করলেন । তার মুখে কেমন যেন উদ্ধিগ্নের একটা ছাপ ফুটে উঠেছে ।
মেয়েটি এবার বলল, কি মনে হচ্ছে ?
বৃদ্ধ বলল, ভাল না । গুলিটা এখনও ভেতরেই রয়ে গেছে । যত সময় না আমরা সেতা বের করতে পারছি তত সময় বিপদ কাটবে না ।
মেয়েটি বলল, কোন ভাবেই বের করা যায় না ?
-এখানে সেই ব্যবস্থা নাই । ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেই হবে !
আমার ব্যাথা আবারও শুরু হল । আমি বুঝতে পারছিলাম আবারও আমি চেতনা হারাবো । কাধের এই দিকটাতে হঠাৎ করে আবার তীব্র ব্যাথা হতে শুরু করলো ।
আমার মুখের ভাব পরিবর্তন হতে দেখে বৃদ্ধ মহিলা বলল, ঔষধের প্রভাব কাটতে শুরু করেছে । আবারও ব্যাথা শুরু হবে । ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেই হবে ।
মেয়েটি আবারও শান্ত কন্ঠে বলল, সেটা সম্ভব না কোন ভাবেই ।
-সম্ভব !
দেখলাম বৃদ্ধ মহিলা আর মেয়েটি পেছনে ঘুরে দাড়িয়েছে । অন্য আরেকজন ঘরের ভেতরে ঢুকেছে ।
ক্ষণে ক্ষণে আমার ব্যাথার পরিমানটা বাড়ছেই । আমি নতুন আসা মেয়েটির দিকে তাকালাম । মেয়েটিকে দেখে প্রথম যার কথা আমার মনে হল সে নিকিতা !
ও এসেছে ?
সাথে সাথেই সিদ্ধান্তটা বাতিল করে দিলাম ।
মেয়েটির মুখ স্কার্ফ দিয়ে আটকানো । কেবল চোখে দেখা যাচ্ছে । এই অল্প আলোর মাঝেও আমি মেয়েটার চোখের দৃষ্টিতে একটা বেদনার ছাপ দেখতে পেলাম !
এই মেয়েটা কি নিকিতা হতে পারে ?
মন খানিকটা দ্বিধায় পরে গেল ।
নিকিতা এখনে কিভাবে আসবে ?
সে তো রয়েছে আমেরিকাতে । তার এখানে আসার কথা না । মেয়েটার চাহনীটা নিকিতার মত ঠিক আছে তবে অন্য কিছুই নিকিতার মত না । বিশেষ করে নিকিতার চোখের মনির রঙ কালো । আমি এই অল্প আলোতেও দেখতে পাচ্ছি সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির চোখে খানিকটা বিড়ালচোখী । বিড়ালের মত । আর মেয়েটার শরীর যেন একটু মোটা ! নিকিতার শরীরে একটুও মেদ নেই । একেবারে স্লীম সে !
এই মেয়েটা কে?
স্কার্ফ পরা মেয়েটি বলল, আমার এক পরিচিত ডাক্তার আছে । ওকে ডাকা যেতে পারে ?
অন্য মেয়েটি বলল, আমরা কারো উপর বিশ্বাস করতে পারি না ম্যাম ! আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন !
-পারছি । কিন্তু আর কি কোন উপায় আছে ?
মেয়েটি কোন জবাব দিলো না ।
স্কার্ফ পরা মেয়েটি বলল, ওকে আগে সেফ হাউজে নিয়ে যেতে হবে । ওখানে ডাক্তার নিয়ে আসা যাবে !
তারপর বৃদ্ধ মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল, মিলনাছড়া পর্যন্ত ওকে নিয়ে যেতে হবে । তারপর ওখান থেকে একটা জিপ ব্যবস্থা করা যাবে । এখন আমাদের আরেকটা উপকার করেন প্লিজ ।
বৃদ্ধ মহিলা মাথা নাড়ালো ।
মেয়েটি আবার বলল, ওকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দিন । আমি আপনার এই উপকার কোন দিন ভুলব না ।
আমাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার কথাই ওরা বলছে । আমাকে কাধে করে কেউ নিয়ে যাবে ব্যাপারটা আমার মোটেই পছন্দ হল না । আমি একা একাই যেতে পারবো । আমি প্রতিবাদ করে উঠতে যাবো তখনই আমার মাথা আবারও ঘুরে উঠলো । আমার মনে হল আমার পুরো শরীর যেন অবস হয়ে গেছে । মাথার ভেতর টা কে যেন ছুড়ি দিয়ে ছিড়ে দিচ্ছে !
আবার সামনে থেকে সব কিছু হারিয়ে গেল মুহুর্তেই । আমি আবারও জ্ঞান হারালাম !
|
|
চলবে.....??
