গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (৬)

 


তৃষার কথাঃ


ঘরের আলো হঠাৎ করে কমে গেছে । তবে একেবারে অন্ধকার হয় নি । আবছায়াভাবে সবকিছু দেখা যাচ্ছে । আমার বাসর রাত হচ্ছে । আমি অন্ধকার ঘরে খাটের উপর বসে আছি। তবে ঘরটা সাজানো হয় নি মোটেও । এই অন্ধকারেও আমি সবকিছু পরিস্কারভাবেই দেখতে পাচ্ছি কারন বাসরটা আমার ঘরেই সাজানো হয়েছে ।


আমি মন খারাপ করে বসে আছি । ঠিক করে কিছু বুঝতে পারছি না । আজকে আমার বিয়ে হওয়ার কথা কিন্তু তার বদলে আমি মন খারাপ করে আছি । বিছানা থেকে নেমে আমি আয়নার সামনে এসে হাজির হলাম । আয়নাতে নিজের চেহারা দেখে চমকে গেলাম । আমার চোখ ফুলে একেবারে ঢোল হয়ে গেছে । প্রচু কান্নাকাটি করেছি সম্ভবত। একটু বেশি কাঁদলেই আমার চোখ ফুলে যায় । চমকে যাওয়ার আরও একটা কারন হচ্ছে আমার শরীরে কোন বিয়ের পোশাক নেই । একটা সাদা রংয়ের শাড়ি পরে আছি আমি । শরীরে কোন অলংকারও নেই ।


আমি বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে । আস্তে আস্তে দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এলাম । পুরো বাড়িটা কেমন সুনশান নিরব হয়ে আছে । কাউকে দেখা যাচ্ছে না । এমনটা তো হওয়ার কথা না । সবাই গেল কোথায় ?


এতো ফাঁকা লাগছে কেন ?


তৃষা !


কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে ।


ডাকটা আসছে আমাদের বাড়ির পেছনের বারান্দা থেকে । আমি করিডোর পার হয়ে পেছনের বারান্দার দিকে হাটা দিলাম । সেখান দিয়ে বাইরে বের হওয়ার একটা পথ আছে । সেখানেই সম্ভবত একজন দাঁড়িয়ে আছে । সে-ই আমার নাম ধরে ডাকছে ।


তৃষা তৃষা তৃষা !


বার কয়েক ডাক দিলো । আমি আরও একটু পা চালালাম । মানুষটার কন্ঠে কেমন একটা ব্যাকুলতা দেখা যাচ্ছে । আমাকে যেন তার এখনই চাই । আমি এগিয়ে যেতে লাগলাম । কিন্তু হঠাৎ মনে হল আমার পা যেন চলছে না । কিছুতে যেন আটকে যাচ্ছে বারবার । যতই এগোতে যাচ্ছি ততই আটকে যাচ্ছে । কিছুতেই সেই দরজা পর্যন্ত যেতে পারছি না ।


তখনই আমার মনে হল যে আমি স্বপ্ন দেখছি । কথাটা মনে হতেই আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম । সত্যি সত্যিই সিমু আমাকে ডাকছে । আমার মুখের উপর তাকিয়ে আছে ।


আমি বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম । সিমু আমার দিকে তাকিয়ে বলল,


-বর চলে এসেছে ।


আমার মনে হল আমি ভুল শুনেছি । অথবা আমি হয়তো এখনও ঘুমেই আছি । একটা স্বপ্নের ভেতরেই আরেকটা স্বপ্ন দেখছিলাম । একটাতে ঘুম ভাঙ্গলেও আরেকটা এখনও চলছে ।


আমি কিছু না বলে সিমুর দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছু সময় । সিমু আবারও বলল,


-আরে গাধা এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন ? বর চলে এসেছে । ঘুমিয়ে চেহারার অবস্থা কি হয়েছে একবার দেখেছিস ।


তখনই আমার মনে হল যে আমি এখন আর স্বপ্ন দেখছি না । সিমু সত্যি কথাই বলছে । আমি কিছু সময় বোকার মত সিমুর দিকে তাকিয়ে রইলাম । সিমু বলল,


-এমন করে তাকিয়ে আছিস কেন ! সত্যিই বর চলে এসেছে ।


-কিন্তু মা যে বলল.....


-এতো কিছু জানি না । কিন্তু বর যে এসেছে এটা সত্যিই । আমি নিজ চোখে দেখেছি । কি যে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি ! নিশ্চয়ই কোন ভুল হয়েছে শুনতে ..... তোর মাকে তো চিনি.... সব সময় চিৎকার চেঁচামিচি .... কি শুনতে গিয়ে কি শুনেছে .....


আমার ঘুম পুরোপুরি কেটে গিয়েছে । এবং সত্যিই যে বর চলে এসেছে এটাও নিশ্চিত হতে পারলাম কিছু সময়ের মধ্যেই । বাবা আমার ঘরে এসে হাজির হল । তার পেছন পেছন মা । মা যেন কিছু একটা বলে বাবাকে আটকানোর চেষ্টা করছে । আমি কিছু একটা শুনলে পেলাম কেবল । মা বাবাকে বলছে,


-ওকে জানানোর দরকার নে....


মা কথাটা আর শেষ করলো না । বাবা আমার দিকে এগিয়ে এল । সিমুর দিকে তাকাতেই সিমু বুঝতে পারলো যে ওর এখন এই ঘর থেকে চলে যাওয়া দরকার । সিমু বিনা বাক্য ব্যয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল । মা দরজা বন্ধ করে দিতেই আবারও কথাটা বলল,


-ওকে কিছু বলার দরকার নেই ।


আমি বললাম,


-কি বলার দরকার নেই ?


-তোর এতো কিছু শুনতে হবে না । বর চলে এসেছে । এখনই বিয়ে পড়ানো হবে !


মায়ের দিকে তাকিয়ে বাবা চোখ গরম করে বলল,


-তুমি চুপ থাকো । ওর জীবনের প্রশ্ন । ওকে জানাতেই হবে !


মা বলল,


-তো কি করবে এখন ওকে জানিয়ে । কিছু করার আছে আর আমাদের হাতে !


-অনেক কিছুই করার আছে ।


বাবা এবার আমার দিকে ফিরে তাকালো । তারপর বলল,


-দেখ মা, আমি তোর উপর কিছু চাপিয়ে দিচ্ছি না । দিবো না । তুই যদি না চাস তাহলে এই বিয়ে হবে না । আমি বরপক্ষকে বলবো, তারা চলে যাবে ।


আমি বললাম,


-বাবা তোমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না । প্লিজ এরকম হেয়ালি না করে সোজাসুজি বল তো ! বর কি সত্যিই পালিয়ে গিয়েছে ?


বাবা খানিকটা সময় চুপ করে থেকে বলল,


-হ্যা, বর পালিয়ে গিয়েছে ।


-তাহলে ?


--নিলয় ফরসালের ছোট ভাই ।


আমি কি বলবো কিছুই খুঁজে পেলাম না । আমার মাথার ভেতরে কেমন যেন ঝিমঝিম করতে লাগলো । তাহলে বর ঠিকই এসেছে কিন্তু ফয়সাল নামের মানুষটা আসে নি । এসেছে তার ছোট ভাই । ফয়সাল নিশ্চয়ই আমার ঐ ঘটনাটা জানতে পেরেছে । তারপর সে বিয়ের জন্য বেঁকে বসেছে । তারপর তার ছোট ভাইকে আমার বাবা হাতে পায়ে ধরে নিয়ে এসেছে ।


এখন আমার কি করা উচিৎ ? বাবাকে বলে দিবো যে আমি এই বিয়ে করবো না । এখানে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না । কিন্তু তারপর ? যতই আমি বলি যে লোকের কথায় আমার কিছু যায় আসে না কিন্তু আমার বাবার তো যাবে আসবে । সমাজে সে বাস করে । তাকে সমাজ মেনে চলতে হয় । এর আগেরবার বাবা প্রায় এক মাস কারো সাথে ঠিকমত কথা বলে নি । ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করে নি । এইবারও এরকম কিছুই হবে । কিংবা হয়তো আরও খারাপ কিছু !


আমি কোন কথা না বলে কিছু সময় কেবল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম । আমার কেন জানি হঠাৎ এই সব কিছু থেকে দূরে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হল । বারবার মনে হল কোথাও পালিয়ে যাই আমি । আমার কিছুতেই মন বসছে না । সেদিন যদি বাবাকে বলে দিতাম এইসব ঝামেলার মধ্যে না যেতে তাহলে আজকে এইরকম একটা পরিস্থিতির ভেতরে আমাকে যেতে হত না । আসলে আমি কেন যে বারবার আশা করি সেটাই বুঝতে পারি না । আমি কেন বারবার ভুলে যাই যে সব মানুষ আসলে একই রকম । মানুষ কেবল আপনাকে হতাশই করবে জীবনে ! আর কিছু না ।


বাবা আবার বলল,


-কিছু বল মা । তুই যা বলবি তাই হবে।


আমি শান্ত কন্ঠে বলল,


-তুমি যা ভাল বুঝো তাই কর । আমার কিছু বলার নেই ।


বাবার মুখে হাসি ফুটলো । আমাকে জড়িয়ে ধরল । আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। এই কাজটুকু না হয় বাবার জন্যই করি । বাবাই তো আছে আমার জীবনে ! আর কে আছে!


বাবা মা চলে যেতেই আমি আবারও বিছানার উপরে বসে পড়লাম । মনের ভেতরে যে কি রকম অনুভূতি হচ্ছে সেটা আমি কোনভাবেই প্রকাশ করতে পারবো না । কোন কিছুই আমি পরিস্কারভাবে প্রকাশ করতে পারবো না । পারছিও না ।


আবারও দরজাতে টোকা পরলো । সম্ভবত সিমু এসেছে । আমি মুখ তুলে তাকালাম । দরজা খুলে যে দিতাম এইসব ঝামেলার মধ্যে না যেতে তাহলে আজকে এইরকম একটা পরিস্থিতির ভেতরে আমাকে যেতে হত না । আসলে আমি কেন যে বারবার আশা করি সেটাই বুঝতে পারি না । আমি কেন বারবার ভুলে যাই যে সব মানুষ আসলে একই রকম । মানুষ কেবল আপনাকে হতাশই করবে জীবনে ! আর কিছু না। 


আবারও দরজাতে টোকা পরলো । সম্ভবত সিমু এসেছে । আমি মুখ তুলে তাকালাম । দরজা খুলে যে মুখটা উঁকি দিলো সেটা দেখে আমি খানিকটা চমকে উঠলাম ।


সেলিম আঙ্কেল ! আমার হবু শ্বশুর !


উনি এখানে কি করছেন ?


সেলিম আঙ্কেল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,


-আসবো মা ?


আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,


-আঙ্কেলআপনি ! আসুন আসুন ।


সেলিম আঙ্কেল দরজা দিয়ে ঢুকে রুমের ভেতর কয়েক কদম হাটলেন । তারপর দাঁড়িয়ে রইলেন কিছু সময় । আমার দিকে তাকিয়ে কিছু যেন বোঝার চেষ্টা করছেন তিনি । তারপর ধীর পায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলেন । আমার বিছানার উপর বসলেন । আমাকে তার পাশে বসতে ইশারা করলেন ।


আমি কোন কথা না বলে বসে পড়লাম । এভাবে কিছু মুহূর্ত কেটে গেল । আমরা কেউ কোন কথা বললাম না । হঠাৎ সেলিম আঙ্কেল বললেন,


-আমি তোমার কাছে অপরাধী মা !


কথাটা বলতে বলতেই তিনি কেঁদে উঠছেল । আমি

সত্যিই এটার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না । কিছু সময় কেবল মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলাম । কি অসহায় লাগছে তাকে ! কি আশ্চর্য ! ঠিক আমার বাবার মত !


আমি বললাম,


-আপনি প্লিজ কাঁদবেন না । প্লিজ !


সেলিম আঙ্কেল কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,


-আমি কাউকে কথা দিয়েছি আর সেটা রাখতে পারি নি এমন কোনদিন হয় নি । কিন্তু আজকে দেখো মা, এই শেষ বয়সে এসে কথার বরখেলাপ করে ফেলেছি । আমি তোমার কাছে অপরাধী মা !


-আপনি কোন অন্যায় করেন নি ।


-করেছি । নিজের ছেলের উপর এতো ভরশা আমার করা ঠিক হয় নাই । ঠিক হয় নাই ।


আমি বললাম,


-আপনি কোন দিক দিয়ে কথার বরখেপাল করলেন শুনি ? এই যে আপনি আমাকে আপনার বাড়ির মেয়ে বানাবেন বলেছিলেন সেটা তো হচ্ছে, তাই না ? আমি তো আপনার মেয়ে হয়ে যাচ্ছি । যাচ্ছি না ?


-তুমি সত্যিই রাজি মা ? সত্যি করে বল ! তুমি যদি বল যে এই বিয়ে তুমি করবে না, আমি এখনই সবাইকে নিয়ে চলে যাবো । মাথা নিচু করে ক্ষমা চেয়ে চলে যাবো !


-আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে না বাবা !!


আমার মুখ দিয়ে বাবা ডাকটা এমনিই বের হয়ে গেল । কেন বের হল আমি বলতে পারবো না। তবে বলতে পেরে ভালই লাগলো আমার কাছে । আামর মুখে বাবা ডাকটা শুনে সেলিম আঙ্কেলের মুখের ভাব বদলে গেল । তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করলেন । তারপর বললেন,


--নিলয় ভাল ছেলে । বিশ্বাস কর মা, বড়টার থেকে কোন অংশে কম না ।


আমি আমার হবু শ্বশুরমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলাম । তিনি তার বড় ছেলের ব্যাপারেও এই একই কথা বলেছিলেন । তবে ছোট ছেলে যেহেতু বাবার এক কথাতেই বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে তখন সম্ভবত সে বড় ছেলের মত হবে না ।


আমার বিয়ে হয়ে গেল । অতিথিদের কেউ ঠিক করে কিছু বুঝতেই পারলো না । বিয়ের আগে আসলে কাউকে ঠিকমত কিছু জানানো হয় নি । আমার বিয়ে যে কার সাথে হচ্ছে সেটা ডলি ভাবি পর্যন্ত জানে না । তারা কেবল আমার শ্বশুরমশাইকে চিনে । তার ছেলের সাথেই আমার বিয়ে হয়েছে । ছেলে যে বদলে গেছে সেটা কেউ টেরও পেল না ।


আমাকে যখন গাড়িতে তোলা হচ্ছিলো তখন আমার কান্না করা উচিৎ ছিল । মা কে জড়িয়ে ধরে, ডলি ভাবি কিংবা সিমুকে জড়িয়ে ধরে । এমনটা সবাই করে । কিন্তু আমার কেন জানি কান্না এলো না মোটেও । সারাদিনে এতো চিন্তা আর মনের উপর দিয়ে এমন একটা চাপ গেছে যে আমার আর কান্না করার কোন এনার্জি ছিল না । আমি মাথা নিচু করে বাবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম, মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিলাম । তারপর গাড়িতে উঠে বসলাম । আমার পাশে আমার সদ্য বিয়ে করা বর বসেছিল । তার চেহারাটা আমি খানিকটা সময়ের জন্য কেবল দেখতে পেলাম । সে আমার দিকে তাকায় নি একবারও । সম্ভবত আমার মত সেও শকড হয়ে আছে । আমি তো তাও বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম, আমার কেবল বর বদলে গেছে কিন্তু এই ছেলে সম্ভবত এই ঘটনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না । সম্ভবত এর একজন প্রেমিকা ছিল !


গাড়ি যখন চলতে শুরু করলো তখন কেন যেন আমার কান্না এল হঠাৎ ।


কান্না কেন এল সেই কারনটা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না । বাসা ছেড়ে আসার জন্য ?


নাহ !


অন্য কোন কারনে আমার কান্না আসতে লাগলো । আমি সেটা থামানোর চেষ্টা করলাম । কিন্তু পারলাম না ।


হঠাৎই পাশ থেকে আবার বর বলে উঠলো,


-কান্না আসলে কাঁদা উচিৎ । আটকে রাখা ঠিক না ।


আমি হুহু করে কাঁদতে শুরু করলাম । এই কান্নার কারন আমার অজানা !

|

|

চলবে....??

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url