গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (৭)
নিলয়ের কথাঃ
আমি ফুটপাথের উপর বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি উদাস চোখে । কিছু দেখছি না নির্দিষ্টভাবে । কেবল সামনের দিকে তাকিয়ে আছি । আজকে ছুটির দিন, তার উপরে এখন আবার দুপুরবেলা । রোদ বেশ শক্তভাবেই তাপ দিচ্ছে । রাস্তাঘাট একটু ফাঁকাই বলা চলে । মানুষজন বেশ কম । নয়তো এভাবে এই রাস্তার ফুটপাথে বসে থাকা যেত না । মাঝে মাঝেই একটা দুইটা গাড়ি চলে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে ।
আমি চুপ করে বসে আছি । কদিন থেকে আমার মাথা ঠিকমত কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে । অবশ্য আমার সাথে যা হয়ে গেছে সেটা অন্য যে কারো সাথে হলে তার মাথাও কাজ করা বন্ধ করে দিত ।
একবার ভাবুনতো বিষয়টা ! আপনি যাচ্ছেন আপনার বড় ভাইয়ের বিয়েতে, পথিমধ্যে আপনার বড়ভাই পালিয়ে গেল। এবং যার সাথে আপনার বড় ভাইয়ের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, সেই মেয়ের সাথে আপনার বিয়ে হয়ে গেল ! ব্যাপারটা কেমন মনে হচ্ছে ?
বিয়ের আসর থেকে বর কিংবা বউ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন না । কিন্তু এইভাবে বড় ভাইয়ের স্থানে ছোট ভাইয়ের বিয়ে হওয়াটা সম্ভবত এই প্রথম ! আমার বাবা কিংবা মেয়ের বাবা কেউ কি একবারও আমাদের দুজনের মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেছে ?
আমি কিংবা ঐ মেয়ে .... আরে দূর, বারবার কেবল ঐ মেয়ে, ঐ মেয়ে করছি কেন ? মেয়েটার নাম তৃষা । সে আইনত আমার বউ । বিয়ে করা বউ । ১০ লক্ষ টাকা দেনমোহর করে বিয়ে করেছি তাকে । বিয়ে করেছি এর বদলে বলা ভাল বিয়ে করতে হয়েছে ।
আমি সম্ভবত তৃষাকে কোনদিন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারব না । তৃষাও সম্ভবত এই কাজটা করতে পারবে না । যদি এমন হত যে ভাইয়ার সাথে ওর বিয়ে হয় নি, অন্য কোথাও বিয়ে হয়েছে, তাহলে তৃষা একটা সময়ে সেটা মেনে নিত কিন্তু সে তো যাচ্ছে আমাদেরই বাসায়। সেটা যেমন আমার বাসা, তেমনি ভাইয়ারও বাসা । যতবার ভাইয়ার সাথে তার দেখা হবে ততবার তার মনে হবে যে এই মানুষটার সাথে তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল কিন্তু হয়েছে তার ছোট ভাইয়ের সাথে ।
আমার বেলাতেও ঠিক একই কথা মনে হবে । যতবার আমি তৃষাকে দেখবো, ততবার আমার মনে হবে যে মেয়েটা আমার ভাবী হওয়ার কথা ছিল অথচ সে আমার বউ হয়ে গেছে । কি অস্বস্তিকর একটা পরিস্থিতি ! এবং এই সবকিছু হয়েছে আমার বড় ভাইয়ের কারনে । সে যদি আরও একটু সাহস করে বাবাকে বলতে পারতো যে সে বিয়ে করবে না তাহলে আজকে আমার কিংবা তৃষার কারোর জীবনটাই এমন হত না ।
-সিগারেট দিমু ?
ডানদিকে তাকিয়ে দেখি ১০/১১ বছরের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে । খালি পা আর হাফ প্যান্ট পরা । শরীরে একটা সেন্ডোগেঞ্জি পরা । হাতে কয়েকটা সিগারেটের প্যাকেট ! আমার দিকে সে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে । আমি বললাম,
-আমি সিগারেট খাই না ।
ছেলেটার মুখটা কালো হয়ে গেল । ঘুরে চলে যেতে যাবে তখন আমি বললাম,
-এখানে বস দেখি ।
-ক্যান ?
-বস । দেখি তোর কাছে কি কি আছে ?
-আপনে না কইলেন খান না !
-আরে খাই না তো কি হইছে । বস । তোর সাথে কয়ডা কথা কই !
-না । আমার কাম আছে !
আমি এবার ছেলেটার হাত ধরে এক প্রকার জোর করেই বসিয়ে দিলাম । তারপর বললাম,
-এই দুপুরে কেউ বিড়ি সিগারেট কিনবে না । খামোখা ঘুরবি । এর থেকে এখানে বস । ৫০ টাকা পাবি ।
টাকার কথা শুনে ছেলেটা একটু যেন অবাক হল । মানুষ খামোখা তাকে টাকা দিবে তা-ও তার সাথে বসে গল্প করার জন্য, এটা সম্ভবত তার বিশ্বাস হচ্ছে না । তবে সে আর উঠলো না । আমার কথায় যে সত্যতা আছে সেটা সেও বুঝতে পেরেছে । এই দুপুরের সময় আশেপাশে মানুষজন খুব একটা নেই । বিকেলের দিকে এদিকে মানুষজন আসে । তখন হয়তো বেচা-বিক্রি কিছু হবে । এর থেকে এখানে আমার পাশে বসে যদি পঞ্চাশ টাকা পাওয়া যায় তাহলে বসে থাকাই ভাল ।
আমি কিছু সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম । তারপর বললাম,
-তোর নাম কি রে ?
-রিপন ! রিপন মিয়া ।
-মিয়া বাড়ির পোলা ?
আমার বলার ভেতরে এমন কিছু ছিল যে ছেলেটা হেসে ফেলল । আমি বললাম,
-তোরা কয় ভাই বোন ?
-চাইর জন । তিনডা বড় বোইন আছে আমার আগে ।
-বিয়ে হয়ে গেছে সবার ?
-দুই জনের হইছে ! আমি একলা থাকি বাপের লগে । মা আর ছোট বোইন থাকে গ্রামে !
-জানিস, আমারও গত সপ্তাহ বিয়ে হয়েছে ।
-সত্য ?
-হুম ।
-মাইয়া দেখতে কেমুন ?
-কি জানি । ভাল করে দেখার সুযোগ হয় নাই ।
-কি কন এডি ? নিজের বউরে নিজেই দেখেন নাই ? মাইয়া কি বুরকা পরে ?
-আরে না, সেইজন্য না । আসলে ঘটনা কি হয়েছে জানিস, বিয়ে হওয়ার কথা ছিল আমার বড় ভাইয়ের সাথে । কিন্তু মাঝপথে ভাইয়া পালিয়ে গেল । আমি রয়ে গেলাম । বাবা আমাকে জোর করে সেই মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল । এখন তুই বল এই ভাবি-বউ নিয়ে আমি কি করবো ? তার দিকে তাকানোর উপায় আছে ?
রিপন হো হো করে হাসতে লাগলো । তার ভাব দেখে মনে হল যেন এর থেকে মজার কথা সে আর জীবনে শোনে নি । আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম তারপরই মনে হল কেন বলছি ওকে এসব কথা ! এসব বলে তো কোন লাভ নেই । কি মনে করে ছেলেটাকে ডাক দিলাম নিজেও জানি না । পকেট থেকে ৫০ টাকার একটা নোট বের করে রিপনের হাতে দিলাম ।
রিপনকে দেখলাম উঠে দৌড় দিল । সম্ভবত কেউ ওকে ডাক দিয়েছে । আমি ঠিক করলাম আজকে রিতুদের বাসায় আর যাবো না । গত সপ্তাহে ওদের বাসায় একদিনও যাওয়া হয় নি । আজকেও যাবো না ঠিক করলাম । এইরকম এলমেলো মন নিয়ে রিতুদের বাসায় যাওয়ার কোন মানে নেই । ওখানে গেলেই নীতুর সাথে দেখা হয়ে যাবে । এটা মোটেই ভাল হবে না আমার জন্য । সম্ভব হলে টিউশনিটা আমার ছেড়ে দিতে হবে ।
মনজুরের কথামত আমিও যদি সেদিন ভাইয়া পালানোর পড়ে পালিয়ে যেতাম তাহলে আজকে আমাকে এই মানসিক ঝামেলার ভেতর দিয়ে যেতে হত না । তবে এটা সত্যি যে এটা করলে বাবার অনেক বেইজ্জতি হত । এভাবে ভাইয়া পালিয়ে গিয়েছে এটা ইতিমধ্যেই জানাজানি হয়েছে । তবে এখন মানুষজন বরং বাবার আরও প্রশংংসা করছে, সেই সাথে আমারও । আমি কিভাবে বাবার এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলাম সেটা নিয়েও অনেক ভাল ভাল কথা বলছে । আমিই হচ্ছি আসল ছেলে, বাবার সম্মান রাখতে জানি, ইত্যাদি ইত্যাদি ।
কিন্তু এই সম্মান রাখতে গিয়ে আমার পুরো জীবনটা যে হুমকির মধ্যে পড়ে গেল সেটা নিয়ে কেউ কোন কথা বলছেনা । বিয়ের দিন আমরা সবাই দাঁড়িয়েই ছিলাম রাস্তার পাশে । বরযাত্রীদের মধ্য ততক্ষণে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে কিন্তু বাবার ভয়ে কেউ কোন কথা বলতে পারছে না । কেবল বড় মামা বাবার সাথে কথা বলছে নিচুস্বরে । কিছু সময়ের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম যে আরেকটা গাড়ি এসে হাজির হল । গাড়ি থেকে উদ্ভ্রান্তের মত মাঝবয়সী এক লোক নেমে এলেন । তার সাথে ভাইয়ার বয়সী একটা ছেলে । তারা বাবা আর বড় মামার সাথে কথা বলতে শুরু করলো । মাঝেমধ্যেই উচ্চস্বরের কথা শোনা যাচ্ছিলো । আমি আমার জীবনে এই প্রথমবারের মত বাবাকে খানিকটা চুপ করে থাকতে দেখলাম । বাবার সামনে কেউ উচুস্বরে কথা বলছে এমনটা আসলে কোনদিন হয় নি । আমি কোনদিন এমনটা দেখি নি । কিন্তু আজকে দেখতে হল ভাইয়ার কারনে ।
একটা সময় দেখলাম মাঝ বয়সী ভদ্রলোক গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন । যেন আর তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না । তাকে অনেকটা ক্লান্তও মনে হল । চেহারা কেমন মলিন মনে হল । ইনিই যে মেয়ের বাবা সেটা আমার বুঝতে কষ্ট হয় নি । হঠাৎ তার চোখ আমার উপর পড়লো । কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি । আমি চোখ সরিয়ে নিলাম । তখনও যদি জানতাম আমাকে দেখার পরে তার মাথায় এই চিন্তা আসবে তাহলে আমি এই লোকের সামনেই আসতাম না । দূরে লুকিয়ে থাকতাম ।
কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে । মেয়ের বাবা তার প্রস্তাব আমার বাবাকে দিয়ে ফেলেছেন। এবং কিছু সময় চিন্তা করে আমার বাবাও রাজি হয়ে গেছে । কিছু সময় পরে আমার বাবা আমার কাছে এসে বললেন,
-তুমিও কি তোমার ভাইয়ের মত আচরণ করবে নাকি আমার মান সম্মানটা বাঁচাবে ?
আমি তখনও ঠিক ধরতে পারি নি আসলে তিনি কি উদ্দেশ্যে আমাকে কথাটা বললেন । আমি বললাম,
-আমি কি করলাম ? বিশ্বাস করুন ভাইয়ার এভাবে চলে যাওয়ার পেছনে আমার কোন হাত নেই । আমি মোটেও টের পাই নি এসবের । টের পেলে আমি আপনাকে সবার আগে জানিয়ে দিতাম ।
বাবা বললেন,
-আমি সেটার কথা বলছি না ।
তখনই আমার মনে খানিকটা সন্দেহ হল । তাহলে বাবা কোনটার কথা বলছেন । বাবা বললেন,
-রাকিব সাহেব একটা সমাধান বের করেছেন ।
-কি সমাধান ?
-উনি তোমার সাথে তৃষার বিয়ে দিতে চান ।
লাইনটা শোনার পরে আমার মনে হল কেউ যেন প্লেন থেকে পড়ে গিয়েছে আর আমার দায়িত্ব পড়েছে সেই মানুষটাকে রক্ষা করার । আমাকেও প্লেন থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে তবে সমস্যা হচ্ছে আমার সাথে কোন প্যারাস্যুট দেওয়া হয় নি ।
আমি চিৎকার করে বলতে চাইলাম যে না বাবা, এটা মোটেই হতে পারে না । আমি কোনভাবেই এই মেয়েকে বিয়ে করতে পারবো না । আমার পক্ষে এই মেয়েকে কোনভাবেই বিয়ে করা সম্ভব না । বাবা বিশ্বাস করেন আমি পারবো না । কিন্তু মুখ দিয়ে আমি একটা কথাও বলতে পারলাম না । আমার নিরবতাকে বাবা কেন জানি সম্মতিই ধরে নিলেন ।
মনজুরকে দেখলাম হাসিমুখে আমার দিকে দৌড়ে আসতে । তার হাতে ভাইয়ার ফেলে রেখে যাওয়া টোপরটা ! বিয়েতে আমি নিজেও শেরওয়ানি পরেই এসেছিলাম । এখন এই টোপর পরে বর সেজে গেলাম ।
যখন বিয়ে বাড়িতে ঢুকলাম, আমি আর নিজের ভেতরে ছিলাম না । কেন জানি মনে হচ্ছিলো আমি এক অন্য জগতে চলে এসেছি । একটা ভ্রম সৃষ্টি হয়েছে আমার চারিদিকে । আমি হয়তো স্বপ্ন দেখছি । যখন কাজী সাহেব আমাকে কবুল বলতে বললেন আমি অনুভব করলাম, বাবার হাত আমার কাঁধে এসে ঠেকেছে । তিনি আমার দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে বললেন,
-কবুল বল বাবা !
আমার মুখ দিয়ে আপনাআপনিই কবুল বের হয়ে এল । তারপর যখন রেজিস্ট্রি খাতায় সাক্ষর করলাম তখনই আমি খানিকটা ধাক্কার মত খেলাম । এতো সময় আমার নীতুর কথা মনে পড়ে নি । নীতু যখন এই ব্যাপারটা জানবে তখন কি বলবে ? কি মনে হবে মেয়েটার ?
আমি আর কিছু চিন্তা করতে পারছিলাম না ।
ফুটপাথ থেকে উঠে দাঁঁড়ালাম । বিকেল হয়ে এসেছে । রোদের তেজ কমে আসছে । একটু পরে হয়তো মানুষজন আসা শুরু করবে । আমি হাটা দিলাম হলের দিকে । আজ আর কিছু করবো না । কোনদিকে যাবোও না ।
হঠাৎই আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো । ফোনটা হাতে নিতেই বুকের ভেতরে খানিকটা ধাক্কার মত লাগলো । রিতুদের বাসা থেকে ফোন এসেছে । একবার মনে হল ফোনটা ধরবো না । কিন্তু পারলাম না । রিতুর মা হয়তো ফোন দিয়েছে । রিতুর নিজের কোন ফোন নেই । ওর কোন দরকার হলে ও ওর মায়ের ফোন দিয়েই ফোন করে ।
আমি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কিছু সময় নিরবতা টের পেলাম । তখনই বুঝে গেলাম যে কে ফোন করেছে ।
ফোনের ওপাশে নীতু আছে আমি জানি । আমি জানি ও এখন কোন কথা বলবে না । চুপচাপ কিছু সময় ফোন কানে চেপে ধরে বসে থাকবে । এর আগেও সে এমন কাজ করেছে । আমি কি করবো বুঝতে পারলাম না ।
নীতু এমন কর না প্লিজ । তুমি আমার প্রস্তাবে আর রাজি হয়োও না প্লিজ । আমি আগে যে দোয়াটা করতাম আজকে সেটার উল্টো দোয়া করলাম । তোমার যেন অন্য একজন বয়ফ্রেন্ড থাকে । আমি কোন কথা না বলে ফোন কানে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম । ওপাশ থেকে নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম বেশ ভালভাবেই । আরও কিছু সময় ফোন কানে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
ফোন কেটে যেতেই আমি হলের দিকে হাটা দিলাম । মনে শান্তি দরকার । এর জন্য ঘুমানো প্রয়োজন । একটু ভালমন্দ খাওয়া পেলেও মন্দ হত না । কোন রেস্টুরেন্টে ঢুকে গেলে ভাল হয়। তখনই ভাইয়ার কথা মনে হল । ভাইয়া নতুন বাসা নিয়েছে । আমাকে যেতে বলেছে । কি মনে হল আমি ভাইয়ার বাসার দিকে হাটা দিলাম । আজকে তার বাসায় থাকব । আমাকে বিপদে ফেলে দিয়ে সে কেমন সুখে আছে সেটা একবার দেখা দরকার !
|
|
চলবে....??
