গল্পঃ ডিয়ার হোম মিনিষ্টার | পর্বঃ (৩)
আজকে সকাল বেলা ঘুম ভেঙ্গে আবারও আমার সিলিংয়ের দিকে চোখ গেল । ভাল করে তাকিয়ে রইলাম কিছুটা সময় সেদিকে । এই সিলিংটার রং হালকা গোলাপী । সিীংয়ের দিকে তাকিয়েই আমি ভাবতে লাগলাম আসলে আমার জীবনে এই মাত্র এক দিনের ভ্যভধানে কি হয়ে গেল । গত পরশু দিন সকালটাও ছিল চমৎকার । নিজের ঘরের সিলিংয়ের আকাশ দেখেই আমার ঘুম ভেঙ্গেছিলো। তারপর পাশ ফিরে তাকাতেই নিকিতার ঘুমন্ত চেহারাটা আমার চোখের সামনে এসে হাজির হয়েছিলো ।
আর গতকালকের সকালে আমার ঘুম ভেঙ্গে কি দেখলাম ! কেবল এক রাতের ব্যবধানে জীবনটা এমন ভাবে বদলে যাবে আমি ভাবতেও পারি নি । সত্যিই পারি নি । সামনে আমার জীবনে কি হবে আমি জানি না ।
আমি কিছু ভাবতে পারছি না । কিভাবে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবো আমি জানি না । আমি সত্যই জানি না । আমি পাশ ফিরে শুলাম । এখন কয়টা বাজে কে জানে ! তবে বেশ সকাল হয়ে গেছে সেটা বুঝতে বাকি নেই । জানালাতে ভারী পর্দা টেনে দেওয়া আছে । তবুও বাইরে থেকে আলো চলে আসছে ভেতরে ।
গতকাল রাতে মেসেজটা আসার পরপরই আমি আর কোন কিছু না ভেবে বাসা থেকে বের হয়ে যাই । সাথে ছিল কেবল মোবাইল ফোন আর কিছু টাকা । আর কিছু নেওয়ার কথা মাথাতে আসে নি । গেট দিয়ে যখন বের হয়ে এলাম তখনই আমার কানে সইরেনের শব্দ এল । বুকের ভেতরটা কেমন লাফাতে শুরু করলো । বারবার মনে হতে লাগলো যে আমাকে কেবল পালাতে হবে । যে দিকে চোখ যায় কেবল সেদিকে পালাতে হবে । আমি কোন কিছু না ভেবে দৌড়াতে থাকি কেবল ।
কতদুর দৌড়েছি আমি জানি না । আমার মাথায় ভেতরে কেবল এই কথাই কাজ করছিলো যে আমার পেছনে পুলিশ গেলে আছে । আমাকে ধরতে আসছে । আমাকে এখন এদের হাত থেকে পালাতে হবে। যদি পুলিশের হাতে ধরা পড়ি তাহলে আমার আর রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় নেই ।
দৌড়াতে দৌড়াতে যখন হাপিয়ে গেছে তখন দম নেওয়ার জন্য আমি একটু থামলাম । ঠিক সেই সময়ে আমার ঠিক সামনেই একটা কালো রংয়ের গাড়ি এসে থামলো । গাড়িটা থামার সাথেই বুকের ভেতরে একটা ধাক্কা অনুভব করলাম । মনে হল এইবার বুঝি আমি ধরাই পরে গেলাম । কিন্তু যখন দরজা খুলে গেল আমি ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা মানুষটাকে দেখে একটা বিস্ময় অনুভব করলাম !
আগেই বলেছি যে আমার স্বাভাবিক ভাবে চিন্তা করার শক্তি হারিয়ে গেছে । আমি কিছুই ভাবতে পারছি না । আমার কাছে কেবল মনে হচ্ছে আমাকে পালিয়ে যেতে হবে । যতদুরে সম্ভব আমাকে পালিয়ে যেতে হবে !
তাই হৃদিকে আমি সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম ।
হৃদি এখানে কিভাবে এল ?
হৃদি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, উঠে এসো ! জলদি !
আমি কোন কথা না বলে গাড়িতে উঠে এলাম । গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে গাড়ি চলতে শুরু করলো । আমি তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি হৃদির দিকে । ওকে কতদিন পরে দেখলাম আমি ঠিক বলতে পারবো না । একবার কেবল কানে এসেছিলো যে ও দেশে ফিরে এসেছে । তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর জয়েন করে নি । আর দেখা হয় নি আমার সাথে ।
আমি বললাম, তুমি এখানে ?
-কেন ? এর আগেও আমি তোমার বিপদে এসেছি, রিমেম্বার ?
তখনই মনে পড়লো আমার । আসলে হৃদির এক বন্ধু আছে ডিবিতে । ও নিশ্চয়ই খবর দিয়েছে হৃদিকে । আমি বললাম
-থ্যাঙ্কিউ ।
-আমাকে থ্যাঙ্কিউ দিতে হবে না । সবার আগে নিজের মোবাইলটা বন্ধ করে । তোমার মোবাইল ট্রাক করে তোমাকে খুজে পেতে সময় লাগবে না ওদের ।
আরে তাই তো এই ব্যাপারটা তো একদম ভাবি নি । আমি দ্রুত মোবাইল অফ করে দিতে ফোনটা হাতে নিলাম । তখনই আমার সেই নাম্বারের কথা মনে পড়লো । মেয়েটা আমাকে সাবধান করেছিলো । নাম্বারটা আরেকবার দেখলাম ভাল করে । মনের ভেতরে গেধে নিলাম । তারপর মোবাইলটা বন্ধ করে দিলাম ।
গাড়িটা বেশ দ্রুতই চলছে । আমি হৃদির দিকে তাকিয়ে আছে । মেয়েটাকে কেমন যেন অপরিচিত মনে হচ্ছে । সেই বছর পাঁচেক আগের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার মত মনে হচ্ছে না । মনে হচ্ছে কোন একশান মুভির হিরোইন । অন্তত ওর পোশাকে দেখেই তাই মনে হচ্ছে । আগে আমি ওকে শাড়ি ছাড়া কিছু পরতে দেখি নি । আজকে ও একটা কালো জিন্সের আর কালো টিশার্ট পরে আছে । তার উপর একটা কালো জ্যাকেট ! আমি সত্যিই ওকে এখানে আশা করি নি ।
প্রায় ঘন্টা তিনেক পরে আমরা একটা বাড়ির সামনে সামলাম । বাড়িটা শহর থেকে অনেক দুরে । সম্ভবত ঢাকার বাইরের কোন এলাকা । আমি এতোই উত্তেজিত ছিলাম যে গাড়ি কোন দিকে যাচ্ছে সেটা খেয়াল করি নি । গাড়ি থেকে বের হয়েই আমি আসে পাশে তাকাতে লাগলাম । চারিদিকে এই এক তলা বাড়িটা ছাড়া আর কিছু নেই ।
-আমরা কোথায় ?
হৃদি আমার সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, সামহোয়ার সেফ ! আপাতত এখানেই থাকো । সামনে দেখা যাক কি করা যায় !
আমি জানালার পর্দার দিকে তাকিয়েই ভাবতে লাগলাম আমার সাথে এই সব কি হচ্ছে আর কেন হচ্ছে ! নিকিতার বাবাই কি এই সবের পেছনে নাকি অন্য কেউ আছে ? অন্য কেউ থাকলে কেন থাকবে ? আমি কারো কি ক্ষতি করেছি ?
আমি দরজা খুলে হৃদিকে ভেতরে ঢুকতে দেখলাম । জানালার পর্দা সরিয়ে দিল । সাথে সাথেই ঘরে রোদ এসে ঢুকলো । আমি বেশ অবাক হলাম । ভেবেছিলাম সকাল হয়েছে কিন্তু রোদের ধরন দেখে মনে হল সকাল পার হয়ে গেছে অনেক আগেই ।
আমি বললাম, কয়টা বাজে ?
হৃদি হাসলো, এতো ঝামেলার ভেতরে মানুষ এতো ঘুমাতে পারে আমার জানা ছিলো না । দুপুরের আযান দিয়েছে আরও অন্তত আধা ঘন্টা আগে !
-কি ?
আমি সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম । আমি প্রায় ১০ ঘন্টা ঘুমিয়েছি ! এই ঝামেলার ভেতরে আমি এতো শান্তিমত ঘুমালাম কিভাবে ? তারপর মনে হল আগের দিক সকাল থেকে আমি প্রচন্ড মানসিক স্ট্রেসের ভেতরে ছিলাম । ধরা পরে যাওয়ার ভয়ে ছিলাম সারাটা সময় । কারো কাছে যেতে সাহস করি নি । কারো কাছে বলতেও পারি নি । বারবার মনে হয়েছে কেউ আমার কথা বিশ্বাস করবে না । হৃদির সাথে দেখা হওয়ার পর মনে হয়েছে যে একজনের উপর ভরশা করা যায় অন্তত । তাই সেই স্ট্রেসটা কমে এসেছে । এএই জন্যই হয়তো ঘুমাতে পেরেছি এতো নিশ্চি্ন্তে ! আমি হৃদির দিকে তাকালাম ভাল করে !এ কটা সাদা রঙয়ের সেলোয়ার কামিজ পরে আছে। গতকাল রাতে ওর দিকে ভাল করে তাকাতে পারি নি । এখন আবার ওকে সেই পরিচিত হৃদি মনে হচ্ছে ।
হৃদি আমার দিকে ওর মোবাইলটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, হোম ক্রিন একটু স্ক্রল করে দেখো !
আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে স্ক্রল করতে শুরু করলাম । পুরো হোম পেইজ জুড়ে কেবল নওরিন আফরোজের মৃত্যুর খবর আর খুনীর খবর । খুনী মানে আমার খবর । কয়েক স্থানে দেখলাম আমার কিছু বই পোড়ানো হচ্ছে । যাদের কে আমি চিনি সবাই আমার বিরুদ্ধে স্টাটাস দিচ্ছে । এটাই স্বাভাবিক । বিশেষ করে আমার রাতের বেলা পালিয়ে যাওয়াটা সবাই কে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে আমিই নওরিন আফরোজকে খুন করেছি । যদি আমি খুন নাই করতাম তাহলে আমি পালাতাম কিভাবে ?
সবার শেষে আমি নিকিতার একটা ভিডিও দেখতে পেলাম । বিদেশে ওর হোটেলে এক সাংবাদিক পৌছে গেছে । সেখানে তাকে আমার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছে ।
নিকিতার মুখটা আমি খানিকটা বিষন্নই মনে হল । সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আমার জীবনে কোন দিন অন্যায়ের সাথে আপোষ করি নি এইবারও করবো না । অপুকে আমি অবশ্যই ভালবাসি এবং সেটা হয়তো পরিবর্তন হবে না কিন্তু ও যদি অপরাধী হয় তাহলে ওকে শাস্তি পেতেই হবে । সুষ্ঠ তদন্ত হবে !
সাংবাদিক তখন প্রশ্ন করলো কিন্তু যা আপনার মত একজন শাক্তিশালী স্ত্রী আছে তার বেলাতে কি তদন্তটা কি সুষ্ঠ হবে বলে মনে করেন ? নাকি এটা সম্ভব ?
নিকিতা কিছু সময় চুপ করে রইলাম । তারপর বলল, আমি জানতাম এই রকমটাই ভাবা হবে । আমার সাথে প্রাইম মিনিস্টারের কথা হয়েছে । আমার অনেক দিনের ছুটি পাওনা ছিল । এই কনফারেন্স টা শেষ হবে আজকে । আমি এখান থেকে আপাতত দেশে ফিরছি না । আমেরিকাতে আমার বড় মামার বাসাতে যাবো । পুরো মন্ত্রনালয়ের তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবে । আমার কোন হাত থাকবে না এখানে । এটা সরাসরি প্রাইম মিনিস্টার থেকে অর্ডার এসেছে ।
সাংবাদিক আর কিছু বলতে গিয়েও বলল না । আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জাহেদ আমানকে আমি খুব ভালা করে চিনি । আমার মনে যে আশা টুকু ছিল সেটাও ধপ করে নিভে গেল । এটা আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে আমার আর বাঁচার কোন আশা নেই । স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জাহেদ আমান আমাকে নিশ্চিত ভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিবে । এই লোক সম্ভবত আমাকে দুনিয়ার সব থেকে বেশি অপছন্দ করে । সেটার পেছনে অবশ্য কারনও আছে ।
আমি হৃদির দিকে তাকালাম । হৃদি বলল, বাহ ! তোমার বউ যে এতো ঈমানদার হবে ভাবি নি !
আমি কিছুই বলতে পারলাম না । সামনে কি করবো সেটাও মাথায় আসছে না । এভাবে নিকিতা আমার উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে ভাবতে পারি নি । আমার সামনে এখন একটা পুলিশ ধরবে তারপর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিবে । দুনিয়ার সব প্রমান হয়তো আমার বিপক্ষে । আমি ঐ রিসোর্টে ছিলাম সেটা প্রমান করতে পুলিশের মোটেই কষ্ট হবে না । আমি ফেইক আইডি ব্যব হার করেছি সেটা একটা শক্ত প্রমান হবে । আমি পালিয়ে গেছি সেটাও একটা বড় প্রমান ! আমার সামনে কেবল একটা পথ খোলা আছে । দেশ ছেড়ে পালানো !
কিভাবে পালাবো আমি !
হৃদি যেন আমার মনের কথা বুঝতে পারলো । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপাতত দেশ পালানোই তোমার পক্ষে সব থেকে ভাল সিদ্ধান্ত হবে !
-কিন্তু কিভাবে ?
-আমার এক পরিচিত মানুষ আছে । সে আমাদের সাহায্য করতে পারবে !
-সত্যিই
-হ্যা !
আমি হৃদির দিকে তাকালাম । তারপর উঠে গিয়ে হৃদিকে জড়িয়ে ধরলাম । মেয়েটার সাথে নিকিতা বেশ খারাপ আচরন করেছিলো ওকে দেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য করে । আমার এতো কোন হাত না থাকলেও এর জন্য আমাকে খানিকটা দায়ভার আছেই । তবুও মেয়েটা আমার জন্য এতো কিছু করছে ।
তাহলে কি জীবনে আমি ভুলই করেছি !
আজকে হৃদি যদি আমার জীবনে থাকতো তাহলে আমার জীবন সত্যিই অন্য রকম হত !
লেখকঃ নিলয় মাহমুদ
|
|
চলবে....?
