গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (২০)

 


তৃষার কথাঃ


আমি কেবল অনুভব করলাম আমার পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে । চোখের সামনে দেখতে পেলাম যে সবগুলো ছেলেমেয়ে একে একে ঘর থেকে বের হয়ে গেল । আমি হাটতে পারলাম না ঠিকমত । আমার শরীরে যেন কোন শক্তি নেই । বুঝতে অসুবিধা হল না আমার প্যানিক এটাক হচ্ছে । আমি নড়তে পারছিলাম না । কেবল এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম একটু সাহায্যের আশায় । কাউকে ডাক দিতে গিয়েও পারলাম না । আমার গলা দিয়ে কোন স্বর বের হল না ।


কয়েকদিন থেকেই আমাদের ক্যাম্পাসের পরিবেশটা স্বাভাবিক নয় । আন্দোলন হচ্ছে । দুই গ্রুপের মাঝে কিছু নিয়ে মতভেদ রয়েছে । সেটা নিয়েই ঝামেলা । সবকিছু থমথমে । বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই ক্লাসে আসে না । আমিও হলেই থাকি বেশিরভাগ সময়ই । তবে আজকে আমার ক্লাসে আসার দরকার ছিল । এসাইনমেন্ট মিস হয়ে গিয়েছিলো বাড়ি যাওয়ার কারণে । সেটা আজকে জমা দিতে বলেছিলেন ম্যাডাম । এইজন্য আমাকে আসতে হয়েছিলো। কিন্তু এখানে এসে এই বিপদে পড়বো আমি বুঝতে পারি নি ।


ক্লাসে থাকতে থাকতেই আমি গ্রেনেড ফাটার আওয়াজ শুনতে পেলাম । তারপর আরও কয়েকটা । গুলির আওয়াজ আসতে শুরু করলো থেকে থেকে । আমি তীব্র ভয় পেতে শুরু করলাম । আমার কাছে মনে হল আমরা কোন যুদ্ধের ময়দানে বসে আছি । মুহূর্তের ভেতরে চিৎকার চেঁচামিচিতে পুরো এলাকা ছেয়ে গেল । চোখের সামনে দেখতে পেলাম সবাই ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে পালাতে শুরু করলো । আমি বের হতে পারলাম না । আমার শরীর যেন অবশ হয়ে গেছে।


আমার স্বাভাবিক চিন্তা করার শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে । এমনটা হয়েছিলো সেদিন । আমার জীবনের সবথেকে ভয়ংকর দিন ছিল সেটা । আমি সেদিনের কথা প্রায় ভুলেই যেতে বসেছিলাম কিন্তু এখন কেন জানি আবারও সেই ঘটনার কথা মনে হতে লাগলো ।


স্কুল আমার সবসময় ভাল লাগতো । স্কুলে আমার কতগুলো বন্ধু ছিল । প্রতিদিন কতরকম ঘটনা ঘটতো । কত আনন্দ আর হাসি কান্না নিয়ে আমার দিন কেটে যেত।


কদিন থেকেই স্কুল থেকে বাসায় যাওয়ার সময় আমার কেন জানি একটু অস্বস্তি লাগতো । আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারতাম । মনে হত কেউ যেন আমার দিকে খারাপ চোখে তাকিয়ে আছে । এই অনুভূতিটা সব মেয়েদের মাঝেই আছে । কেউ যদি মেয়েদের দিকে খারাপ চোখ নিয়ে তাকায় তাহলে মেয়েরা সেটা বুঝতে পারে । আমিও বুঝতে পারতাম এই ব্যাপারটা । তবে এমনটা হওয়া স্বাভাবিক । রাস্তায় চলতে ফিরতে মেয়েদের এই অভিজ্ঞতাটা হওয়াটা স্বাভাবিক আমাদের দেশে ।


তবে আমি খুব বেশি চিন্তিত হতাম না । আমাকে কখনও একা একা স্কুল থেকে বাসায় যেতে হত না । আমার সাথে আমাদের রাইস চাচা যেত সবসময় । স্কুল থেকে বাসায় আসার জন্য একটা বেবিট্যাক্সি ঠিক করা ছিল আমার জন্য । তবে বেবিট্যক্সি থেকে নেমে স্কুল পর্যন্ত যাওয়া এবং স্কুল থেকে বেবিট্যাক্সি পর্যন্ত আসা - এই সময়টুকুতে আমার মনে এই অস্বস্তিটা কাজ করতো । এমন একটা অনুভূতি বেশ কদিন থেকেই হচ্ছিলো আমার ভেতরে । বারবারই কেবল মনে হচ্ছে কেউ যেন আমার উপর নজর রাখছে


ঘটনার দিন যথারীতি আমি স্কুল থেকে বের হয়ে হাটতে শুরু করলাম বেবিট্যাক্সির দিকে । স্কুলের সামনেই সেটা রাখা থাাকতো । আমি জানি সেখানে রাইস চাচা বসে আছেন । স্কুলের সব বান্ধবীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি রাস্তা পার হওয়ার জন্য পা বাড়ালাম । আমার মনে অন্য কোন চিন্তা নেই । আমি অন্য কোন দিকে তাকাচ্ছিও না । আমার চোখ কেবল সামনের দিকে । বেবিট্যাক্সিতে উঠবো তারপর বাসায় যাবো । রাস্তার ঠিক মাঝ বরাবর এসেছি, তখনই ঘটনাটা ঘটলো


একটা মাইক্রোবার বাস কোথা থেকে যেন এসে আমার সামনে থামলো । আমার এতো কাছে এসে থেমেছে যে আমি তীব্র অবাক হয়ে গেলাম । আরেকটু হলে আমাকে চাপা দিয়ে দিতো । এই চিন্তাটাও তখন আমার মাথার ভেতরে আসে নি, তার আগেই দরজা খুলে গেল । চারটা হাত আমাকে শক্ত করে চেপে ধরলো । আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে একটানে মাইক্রোর ভেতরে টেনে নিয়ে গেল ।


ঘটনাটা ঘটতে খুব বেশি হলে ১৫/২০ সেকেন্ড লাগলো । আমি চিৎকার দেওয়ার আগেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল আর গাড়ি চলতে শুরু করলো । আমি জানি না স্কুলের সামনে থাকা মানুষগুলো আমাকে দেখেছে কি না, তবে আমার মনে তীব্র একটা ভয় চেপে ধরলো । আমি কোন কিছু চিন্তা করতে পারছিলাম না । স্বাভাবিক কোন চিন্তা করার ক্ষমতা আমার হারিয়ে গেল । আমার মনে হল যেন আমার আর কোন শক্তি নেই । আমার কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমার পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে এল । আমার কেবলই মনে হতে লাগলো যে এই মানুষগুলো আমাকে নিয়ে যাবে । তারপর আমার সাথে ঐ খারাপ কাজগুলো করবে । এই রকম গল্প আমি অনেক শুনেছি । আমার কিছু করার থাকবে না । তারপর এরা হয়তো আমাকে মেরে ফেলবে । আমি আর কোনদিন আমার বাবাকে দেখতে পাবো না । কোনদিন আমার মাকে দেখতে পাবো না ।


যখন জ্ঞান ফিরে এল নিজেকে আমি আমার বাবার বাহুডোরে পেলাম । চারিদিকে বেশ কয়েকজন পুলিশ দেখতে পেলাম কেবল । আমার বাবা বারবার আমাকে বলছে,


-কোন ভয় নেই মা, এই তো আমি চলে এসেছি । তোমার কোন ক্ষতি হয় নি ।


আমার কেবল মনে হচ্ছিলো যেন আমি স্বপ্নে দেখছি । এখনই আমার স্বপ্ন ভাঙ্গবে এবং আমি দেখতে পাবো নোংরা ঐ মানুষগুলো আমাকে ঘিরে রেখেছে । আমার শরীরের নানা দিকে হাত দিচ্ছে । এই ভাবনা আসতেই আমার দুনিয়া আবার অন্ধকার হয়ে গেল । আমি আবারও জ্ঞান হারালাম ।


আমার পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে প্রায় মাসখানেক সময় লেগেছিলো । বাবার কাছে শুনেছিলাম যে সেই একটা মাস আমি ঠিকমত কারো সাথে কথা বলতাম না, কিছু খেতে চাইতাম না । এমনকি একবার কাঁদিও নি । আমি নাকি পাগল পাগল আচরণ করেছিলাম ।


আমি আরেকটা গ্রেনেড ফাটার আওয়াজ শুনতে পেলাম । আমি ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে কেউ নেই । সবাই বের হয়ে গেছে ক্লাসরুম থেকে । কেবল আমি একা একা বসে রয়েছি । কোনরকমে বেঞ্চ থেকে উঠে দেওয়ালের পাশে হেলাম দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লাম । বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতে লাগলো । আমি বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলাম । নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলাম ।


বাবা আমাকে সেদিনই বলেছিলো যে বিপদে সবসময় প্রিয় মানুষের কথা ভাবতে হয় । তার চেহারা সামনে আসলে মনটা শান্ত হয় । তখন বুকে শক্তি পাওয়া যায় । আমি চোখ বন্ধ করে কিছু সময় আমার প্রিয় মানুষগুলোর কথা চিন্তা করতে শুরু করলাম । বাবা মায়ের চেহারা আসার কথা ছিল কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো । হাসি হাসি মুখ করে ছেলেটা আমাকে দেখছে । আমার দিকে তাকিয়ে লাজুকভাবে কথা বলছে ।


 কোথায় আছে এখন ? ও কি এখন ক্যাম্পাসে ? ও নিজেই কি এমন বিপদে পড়েছে?


আমি তখনই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে আমার নিজের বিপদের থেকে আমার কাছে ের বিপদে পড়ার ব্যাপারটা বেশি চিন্তার হয়ে দাঁড়ালো ।


ওর সাথে ঐদিন আমি খারাপ ব্যবহার করেছি । মনটা আমার খারাপ হয়ে গেল । এখন যদি আমার কিছু হয়ে যায় তাহলে  হয়তো সারাজীবনে এটাই ভাববে যে আমি ওকে ভালবাসি না । কিন্তু কথাটা তো সত্যি না । ও আমাকে ভালবাসুক কিংবা না বাসুক, আমি তো ওকে ভালবাসি । জীবনে এইভাবে আমি কাউকে ভালবেসেছি কি না আমার জানা নেই । ওকে কথাটা বলা দরকার । অবশ্যই জানানো দরকার !


আমি ফোন হাতে নিলাম । একটু একটু হাতে কাঁপছিলো । ওর নাম্বারে কল দেওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই ও ফোনটা ধরলো । বলল,


-হ্যালো তৃষা ? কেমন আছো তুমি ?


আমি কিছু সময় কোন কথা বলতে পারলাম না ।


ওপাশ থেকে  বলল,


-বিশ্বাস কর নীতুকে আমি ভালবাসি না । তোমার সাথে বিয়ের পর আমি অন্য কোন মেয়ের কথা চি্ন্তাও করি নি । বিশ্বাস কর !


আমি একটা জোরে নিঃশ্বাস নিলাম । তারপর বললাম,


-আমি জানি ।


-তুমি জানো ?


-হ্যা, খুব ভাল করে জানি । মানুষের চোখ কখনও মিথ্যা বলে না ।


আমি ওপাশ থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়তে শুনলাম যেন ।  বলল,


-শোন, আজকে কিন্তু হল থেকে একদম বের হবে না । ক্যাম্পাসে ঝামেলা হচ্ছে । আমি বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েছিলাম কাল । তুমি ধরো নি ।


আমার কেন জানি কান্না এল খুব । ওকে দেখতে ইচ্ছে হল । আমি নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে লাগলাম । ওপাশ থেকে  বলে উঠলো,


-তৃষা !


-হুম !


-তুমি কি ক্যাম্পাসে গিয়েছো ?


-হুম !


-বাইরে কি গোলাগুলি হচ্ছে ?


আমাকে কিছু বলতে হল না । ঠিক সেই সময়েই কাছে কোথাও আরেকটা গ্রেনেড ফাটলো । পুরো বিল্ডিং কেঁপে উঠলো । ের চিৎকার শুনতে পেলাম । বলল,


-তুমি থাকো । আমি আসছি ....


আমি চিৎকার করে বলতে চাইলাম, তুমি এসো না । কিন্তু বলতে পারলাম না । আমার কেন জানি কে খুব বেশি দেখতে ইচ্ছে করছিলো । ওকে একবার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিলো ।


 কখন আসবে ?


ও কি হলে আছে ? নাকি অন্য কোথাও রয়েছে ? কত সময় লাগবে আসতে ?


আমি অধীর হয়ে ের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলাম । আমার কেবল মনে হতে লাগলো কে এখনই আমার জড়িয়ে ধরতে হবে ! কিন্তু এই বিপদের মাঝে ওকে আমি কেন আসতে বলবো? ওকে বরং মানা করি । ও না আসুন ! আমি এখানে লুকিয়ে থাকি !


আমি আবার ফোন দিলাম ওকে । একবার রিং হতেই ও আবার ফোনটা ধরলো ।


-হ্যালো ? তুমি ঠিক আছো তো ?


আমি নিজেকে সামলে নিলাম । অনুভব করলাম যে ের কন্ঠস্বর শুনে আমার মনে একটু শান্তি ফিরে আসতে শুরু করেছে । ওর কন্ঠ আমার প্যানিক এটাকটা কাটাতে সাহায্য করছে ।


আমি বললাম,


-হ্যা, ঠিক আছি । ওরা সম্ভবত ভেতরে আসবে না ।


-হ্যা আসবে না । ওরা ক্লাসরুমে স্বাধারণত ঝামেলা করে না । তুমি বসে থাকো চুপ করে । একদম বের হবে না । আমি আসছি ।


-তুমি না হয় এসো না । সব কিছু শান্ত হলে আমি বের হব নি !


কথাটা বললাম যদিও মন চাইছিলো অন্য কিছু । আমি খুব করে চাচ্ছিলাম যেন ও আসে ।  বলল,


-তুমি বসে থাকো । আমি আসছি ।


আমি জানতে চাইলাম,


-তুমি কোথায় আছো ?


-আমি একটু বাইরে । মোহাম্মাদপুরে । বেশি সময় লাগবে না । আমি চলে আসবো ! আর ভয় পাবে না একদম । কিছু হবে না । বুঝতে পরেছো ?


আমি মাথা নাড়ালাম । আমি ভয় পাবো না । মোটেও ভয় পাবো না ।


 আসছে !


আচ্ছা  কি সত্যিই ঐ মেয়েটাকে ভালবাসে ?


নিজের মনোভাব দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম । আমি এতো সময় কি ভাবছিলাম আর এখন আমার মনে কোন কথা আসছে । কেন আসলো ?


ঐদিন মেয়েটা কিভাবে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলো যে  ওকে ভালবাসে!


আমার কথাটা বিশ্বাস হয় নি । কিন্তু কষ্ট হয়েছিলো । খুব বেশি কষ্ট হয়েছিলো । আমি জানি  আমাকে ভালবাসে । ওর চোখ সেই কথাই বলে ।


তারপরেও মেয়েটা কিভাবে বলল কথাটা ? কেন বলবে ?


 কেবল আমাকে ভালবাসবে । আমি জানি আমার সাথে বিয়ের আগে ের পছন্দ ছিল মেয়েটা ।  নিজেই আমাকে এই কথাটা বলেছিলো । এইবার যখন আমি ওদের বাসা থেকে ফিরে আসছিলাম তখনই কথাটা বলেছিলো । বলেছিলো যে একটা মেয়েকে ও পছন্দ করতো কিন্তু কোনদিন বলা হয় নি । শুনে আমার খারাপ লেগেছিলো তবে মেয়েটার মুখ থেকে শুনে আমার তীব্র কষ্ট হয়েছিলো । সেটা আমি কিছুতেই ভুলে যেতে পারছিলাম না। কিছুতেই না। আমার কেবল মনে হচ্ছিলো যে আগে হোক, পরে হোক,  কেবল আমাকে পছন্দ করবে । অন্য মেয়েকে কেন পছন্দ করবে সে !


কেন কেন কেন !

|

|

চলবে.....??

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url