গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (২১)

 


নিলয়ের কথাঃ


আমার কাছে মনে হল যেন গাড়িটা অন্ততকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে । একটুও যেন নড়ছে না । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম মাত্র ৫ মিনিট পার হয়েছে অথচ আমার কাছে মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ধরে আমি অপেক্ষা করছি ।


নিজের চুল নিজেই ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে । বারবার মনে হচ্ছে আজকে কেন আমি মোহাম্মাদপুরের বাসায় থাকতে এলাম । কি হত যদি আমি হলে থাকতাম । তাহলে তো সমস্যা হত না । আমি এক দৌড়ে চলে যেতে পারতাম তৃষার ডিপার্টমেন্টের সামনে ! মেয়েটা ক্লাসরুমে আটকা পড়েছে । কি করছে কে জানে !


তৃষার জন্য আমার মনের ভেতরের ব্যাকুলতা দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম । মেয়েটাকে আমি সত্যি সত্যিই এতো ভালবাসতে শুরু করেছি !!


গত সপ্তাহেই ব্যাপারটা আমি ভাল করে টের পাই । ওর প্রতি যে আমি তীব্র ভালবাসা অনুভব করছি সেটা আমি অনুভব করতে পেরেছি গত সপ্তাহেই । তৃষার আব্বার সাথে ঐদিন দেখা করার পর থেকে একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারছিলাম যে আমাদের ভেতরের সম্পর্কটা একটু একটু ভাল হচ্ছে । সত্যিই ভাল হচ্ছে । ও নিজ থেকে আমাকে ফোন দিতে শুরু করলো, ক্লাস শেষ করে আমার সাথে দেখা করতো । টুকটাক গল্প করতো ! আমার নিজেরও ভাল লাগতে শুরু করলো । সারাটা সময় মনের ভেতরে কেমন একটা আনন্দবোধ লেগেই থাকতো !


কিন্তু এক সপ্তাহ পরে কি হল আমি বুঝতেই পারলাম না । তৃষা দুইদিন একদম যোগাযোগ করলো না । আমি কয়েকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারলাম না । তিন দিনের দিন ওকে পেলাম । যখন বললাম কি হয়েছে সে আমার দিকে তাকিয়ে কেবল বলল,


-এতো উতলা কেন হচ্ছো কথা বলার জন্য । আমাকে তো আর ভালবাসো না, আমার ভেতরে তো কিছু নেই যে তুমি আমাকে ভালবাসবে ! যাকে ভালবাসো তার কাছেই যাও !


আমি তৃষার কন্ঠে কেবল তীব্র অভিমান অনুভব করছিলাম । ওকে আমি আগেই নীতুর কথা বলে দিয়েছিলাম । বলেছিলাম যে আগে একটা সময় একটা মেয়েকে আমি পছন্দ করতাম কিন্তু কোনদিন তাকে বলি নি । ঘটনাটা সেখানেই শেষ । তাহলে ও আমাকে কেন এই কথা বলল।


তৃষার কাছে জানতে চাইলাম,


-এই কথা কেন বললে ? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ।


-কিছু বুঝতে হবে না । আমি যাই ।


আমি ওর হাত ধরলাম । ও সেটা ছাড়িয়ে দিল । তারপর বলল,


-আমি একা থাকতে চাই । দয়া করে এমনভাবে ফোন দিবানা প্লিজ !


ও চলে যাওয়ার পরপরই ব্যাপারটা আমার মাথায় এল । আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো যে নীতু তৃষাকে কিছু বলেছে । ঐদিন আমার পিছু পিছু যখন আসছিলো তখনই সে তৃষাকে দেখেছে । হয়তো একা পেয়ে কিছু বলেছে । আমার মাথার ভেতরে আগুন ধরে গেল । আমি তখনই নীতুদের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম । রিতুর মা দরজা খুলে দিল । আমার চেহারাতে কিছু ছিল যেটা দেখে তিনি বললেন,


-কি হয়েছে বাবা, তোমাকে এমন কেন দেখাচ্ছে ?


আমি যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত করে বললাম,


-আন্টি, নীতু কোথায় ?


-ঘরে রয়েছে ।


-ওকে ডাকুন প্লিজ !


-কি হয়েছে বলতো !


-প্লিজ ওকে ডাক দিন ।


নীতুকে আলাদাভাবে ডাকতে হল না । আমার কন্ঠস্বর শুনেই সে ঘর থেকে বের হয়ে এল । আমি ওর দিকে তাকিয়ে সরাসরি বললাম,


-তুমি তৃষাকে কি বলেছো ?


দেখলাম মুহূর্তেই ওর মুখ কালো হয়ে গেল । সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,


-যা সত্য তাই বলেছি !


আমার মাথার আগুন ধরে গেল । আমি নীতুর দিকে তাকিয়ে কঠিন কন্ঠে বললাম,


-এরপর যেন তৃষার সাথে কোন কথা না বলতে দেখি তোমাকে । ব্যাপারটা ভাল হবে না ।


নীতুর মা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না । আমার মত শান্ত একটা ছেলে কিভাবে এমন কঠিন কন্ঠে কথা বলছে সেটাও সম্ভবত তিনি বুঝতে পারছিলেন না । তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কি ব্যাপার ? কি হয়েছে আমাকে বলবা প্লিজ ! তুমি এমন করে কেন কথা বলছো?


আমি এবার নীতুর মায়ের দিকে ফিরে তাকালাম । তারপর বললাম,


-আপনার মেয়ে আমার স্ত্রীর কাছে গিয়ে কি সব উল্টাপাল্টা কথা বলে এসেছে ! ওকে আপসেট করে দিয়েছে !


নীতুর মা অবাক হয়ে বললেন,


-তুমি বিবাহিত !


-হ্যা !


-কই আমাদের তো বল নি ?


-এটা কেন বলতে হবে আপনাদের ? আমার কাজ ছিল রিতুকে পড়ানো । আমি বিয়ে করেছি কি করি নি সেটা তো আপনাদের জানানোর দরকার নেই !


আমার কথার বিপরীতে সম্ভবত কিছু বলার সুযোগ পেলেন না তিনি । আমি আবার বললাম,


-আপনার মেয়েকে সাবধান করে দিবেন দয়া করে । আমি খারাপ ব্যবহার করতে চাই না কিন্তু এরপর যদি সে এমন কাজ করে তাহলে কিন্তু ভাল ব্যবহার করবো না । আমার আর আমার স্ত্রীর জীবন থেকে দূরে থাকতে বলবেন তাকে।


নীতু সম্ভবত এমনটা আশা করে নি । ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে । আমাকে অবশ্য সেই পানি মোটেই বিচলিত করলো না । আমি চলে এলাম ওদের বাসা থেকে । সেইদিনই আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে তৃষাকে কেউ কিছু বললে সেটা আমার মোটেই সহ্য হবে না ।


আমি আবার ঘড়ির দিকে তাকালাম । সামনের রাস্তাটা পুরোপুরি জ্যামে আটকে আছে । আমার মনে হল আমার পক্ষে আর দেরি করা সম্ভব না । আজকে হয়তো এই জ্যাম আর ছাড়বে না ।


আমি বাস থেকে নেমে গেলাম । তারপর আর কিছু না ভেবেই দৌড়াতে শুরু করলাম । আমার মাথায় কেবল একটা চিন্তাই কাজ করছে । আমার কেবলই মনে হচ্ছে যে আমার যে কোন ভাবেই হোক তৃষার কাছে পৌঁছাতে হবে । কত সময় আমি একভাবে দৌড়েছি বলতে পারবো না । একটা সময় আবিষ্কার করলাম যে আমি তৃষার ডিপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে হাজির হয়েছি । চারিদিকে তখনও থেকে থেকে মারামারি হচ্ছে । আমি সেসব কিছু গ্রাহ্য করলাম না। সরাসরি ঢুকে গেলাম ওদের বিল্ডিংয়ে ! আমার কোন হুশ নেই তখন । পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে । আমি জোরে জোরে দম নিচ্ছি । মনে হচ্ছে যেন আমি এখনই দম আটকে মারা যাব । তবে আমার থামা চলবে না । আমার পৌঁছাতেই হবে তৃষার কাছে ।


ওর ক্লাসরুম দুইতলাতে । পুরো বিল্ডিংয়েই যেন কেউ নেই । আমি সিঁড়ি দিয়ে দুইতলাতে পৌঁছে গেলাম । প্রথম ক্লাসরুমে ঢুকে দেখলাম সেখানে কেউ নেই । দ্বিতীয়টাতে ঢুকতেই আমার জানে পানি ফিরে এল । দেখলাম তৃষা দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে মেঝেতে । আমাকে দেখতে পেয়েছে !


আমাদের দুজনের ভেতরে কি হল আমরা কেউ বলতে পারবো না । আমি কেবল দেখতে পেলাম তৃষা উঠে আমার দিকে দৌড় দিল । তারপর আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ! আমাদের বিয়ের পর প্রথমবারের মত তৃষা আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরলো !

|

|

চলবে....??

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url