গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (১৯)
নীতুর কথাঃ
নিলয় অন্যদিকে তাকিয়ে আছে । আমার দিকে তাকাচ্ছে না একদম ! আমার খুব কষ্ট হতে লাগলো । এতো কষ্ট যে আমি মোটেও সেটা প্রকাশ করতে পারবো না । বারবার মনে হল আমি সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি । আমার ভালবাসার মানুষটাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি ।
আমার মাথার ভেতরে আর কোন চিন্তা এল না । আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না । আমার কেবলই মনে হল যে আমি হারিয়ে ফেলেছি ওকে । আমি নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-আমার সাথে এমন বিট্রেটা করতে পারলে তুমি ?
নিলয় অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল । আমার কথা শুনেই আমার দিকে ফিরে তাকালো । তারপর বলল,
-কি বললে তুমি ? বিট্রে?
নিলয়ের কন্ঠস্বরটা হঠাৎ বদলে গেল । আমার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । কিছুটা বিস্মিত আর কিছুটা ক্ষুদ্ধ সে !
গত কয়েকদিন থেকেই আমি নিলয়ের সাথে কথা বলতে চাইছিলাম । মনে মনে বলছিলাম যে অনেক হয়েছে লুকোচুরি । এবার সবকিছু বলে দেওয়াই ভাল । আমি ওকে আমার মনের কথা বলে দিব আর ও নিজেও আমাকে নিজের মনের কথা জানাবে । ব্যস, সব ঝামেলা চুকে যাবে ! কিন্তু আমার মন বলছিলো যে আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি । তবুও বারবার এটাই আশা করেছিলাম যে আমার চিন্তাটা যেন মিথ্যা হয় । এটা যেন কোনভাবেই সঠিক না হয় !
ক্যাম্পাসে আজকে আমাদের একটা অনুষ্ঠান ছিল । ক্যাম্পাস থেকে বের হতে হতে বিকেল হয়ে গেল । আমি বাসায় ফেরত যাওয়ার জন্য রিক্সা খুঁজতে লাগলাম । কিন্তু একটা রিক্সাও চোখে পড়লো না। মনে হল যে নীলক্ষেতের দিকে গেলে হয়তো একটা রিক্সা পাওয়া যাবে । আর কিছু না ভেবে হাটতে লাগলাম । একটু হাটার পরই আমি নিলয়কে দেখতে পেলাম । সেই মেয়েটার সাথেই দাঁড়িয়ে আছে । একে অন্যের দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে আছে । এই চোখের দৃষ্টি আমার চেনা । মেয়েটা নিলয়কে ভালবাসে । তার তাকানোর ধরণ কিংবা কথা বলতে গিয়ে মেয়েটার অঙ্গভঙ্গি স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে যে মেয়েটা নিলয়কে ভালবাসে । এবং নিলয় নিজেও ওকে ভালবাসে । আমার পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে এল । নিজেকে খানিকটা প্রতারিত মনে হল !
এতোদিন আমাকে ভালবেসে এখন এই ছেলে অন্য মেয়েকে ভালবাসছে !
আমি দাঁড়িয়ে গেলাম । একটু পরে দেখতে পেলাম মেয়েটা হলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আর নিলয় নিজের হলের দিকে হাটতে শুরু করলো । আমিও আপনাআপনি ওর পেছন পেছন হাটতে শুরু করলাম । কেন হাটছি আমি নিজেই জানি না । তবে আমার কেন জানি খুব রাগ হতে শুরু করলো । নিলয় আমার সাথে এমনটা কেন করলো আমাকে সেটা জানতে হবে ।
বেশিদূর হাটতে হল না । এক সময় দেখলাম নিলয় নিজেই পেছন ঘুরে তাকালো । আমাকে দেখতে পেয়ে খানিকটা অবাক হল বটে । তারপর আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে এল । আমার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমি বললাম,
-ঐ মেয়েটা কে?
নিলয়ের মুখের তাকিয়ে মনে হল ও যেন একটু অস্বস্তিতে পড়েছে । বলল,
-আসো ঐখানটায় বসি !
হাত দিয়ে পাশের উদ্যানে একটা সিমেন্টের বেঞ্চ দেখালো সে । আমি কোন কথা না বলে সেখানে গিয়ে বসলাম । নিলয় অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
-তৃষার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে ।
আমি ভেবেছিলাম হয়তো মেয়েটার সাথে ওর কিছু একটা চলছে । আমি ওকে পাত্তা দিচ্ছি না এটার কারণে ও হয়তো ঐ মেয়েটার দিকে আকৃষ্ট হয়েছে । কিন্তু বিয়ে !
আমি মুখ ফুটে বললাম,
-বিয়ে ? কখন ? কিভাবে ?
নিলয় এবারও আমার দিকে তাকালো না । বলল,
-মনে আছে আমার ভাইয়ার বিয়ের কথা ! আমি ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম । আসলে একটা দুর্ঘটনা ঘটে সেখানে । ভাইয়ার সাথে বিয়েটা আর হয় নি । আমার সাথে হয়েছে ।
আমার মাথা ঘুরতে শুরু করলো । আমি কি বলবো খুঁজে পেলাম না । আমি নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-আমার সাথে এমন বিট্রেটা করতে পারলে তুমি ?
নিলয় অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল । আমার কথা শুনেই আমার দিকে ফিরে তাকালো । তারপর বলল,
-কি বললে তুমি ? বিট্রে?
নিলয়ের কন্ঠস্বরটা হঠাৎ বদলে গেল । আমার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । কিছুটা বিস্মিত আর কিছুটা ক্ষুদ্ধ সে ! বলল,
-শোন নীতু, আমি তোমার জন্য কম সময় ধরে অপেক্ষা করি নি । তুমি কচি খুকি না, সব তুমি জানতে, বুঝতে । তারপরেও দিনের পর দিন তুমি আমাকে অপেক্ষা করিয়েছো । আমি অপেক্ষা করেছি । হয়তো আরও কিছুদিন আমি অপেক্ষা করতাম । কিন্তু ঐদিন যখন আমার বাবা তার মানসম্মান বাঁচাতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো তখন আমি আর কিছু ভাবতে পারি নি । তারপরেও যদি আমি তোমাকে কথা দিতাম তাহলে আমি তৃষাকে বিয়ে করতাম না । তুমি আমাকে এমন কোন কথা দিয়েছিলে নাকি কোন ইঙ্গিত দিয়েছিলে ? দিয়েছিলে কি ?
আমি নিলয়ের কন্ঠের উত্তাপটা অনুভব করলাম । সত্যিই আমি ওকে কোন ইঙ্গিত দেই নি। নিলয় বলল,
-তাহলে আমি এমন একটা সম্পর্কের জন্য কেন বসে থাকবো ? কেন আমার বাবার কথা শুনবো না ? বিট্রে করলাম কোথায় ?
নিলয় একটু থামলো । উঠে দাঁড়িয়ে কিছু সময় এদিক ওদিক হাটলো । তারপর আবারও আমার কাছে ফিরে এসে বলল,
-একটা সময় আমি তোমাকে অসম্ভব পছন্দ করতাম । তোমাকে পেতে চাইতাম । এটা স্বীকার করতে আমার কোন দোষ নেই । কিন্তু তুমি আমাকে বড় বেশি সময় অপেক্ষা করিয়েছো । আশা করি বুঝতে পারছো আমি কি বলতে চাইছি ।
নিলয় আর দাঁড়ালো না । আমাকে ওখানে রেখেই ও হাটা দিল । আমার কেন জানি চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করলো খুব । কিন্তু আমি কাঁদতে পারলাম না । তার বদলে আমার কেবল ঐ মেয়েটার উপর রাগ হল । বারবার কেবল মনে হল যে ঐ মেয়েটা আমার কাছ থেকে নিলয়কে কেড়ে নিয়েছে । আমি মেয়েটার উপর একটা তীব্র রাগ অনুভব করলাম । এই রাগের উৎস আমার জানা নেই ।
ঠিক এক সপ্তাহ পরে মেয়েটাকে আমি দেখতে পেলাম আমাদের ডিপার্টমেন্টের সামনে । আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে মেয়েটা নিলয়ের জন্য দাঁড়িয়ে আছে । আমি যতদূর জানি নিলয়ের ক্লাস শেষ হতে এখনও খানিকটা বাকি আছে ।
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম মেয়েটার দিকে । আমার থেকে সম্ভবত একটু বড়ই হবে । হোক । তাতে কিছুই যায় আসে না ।
আমি মেয়েটার সানে গিয়ে দাঁড়াতেই মেয়েটা আমার দিকে খানিকটা কৌতূহল নিয়ে তাকালো। তারপর বলল,
-কিছু বলবেন ?
-হ্যা ।
-বলুন !
-কার জন্য অপেক্ষা করছেন ?
দেখলাম আমার এই কথা শুনে একটু বিরক্ত হল । বলল,
-সেটা কি জানা খুব জরুরী ?
-হ্যা । আপনি আামর ডিপার্টমেন্টে দাঁড়িয়ে আছেন আবার মুখে মুখে কথা । আপনি জানেন না যে এক ডিপার্টমেন্টের ছেলে মেয়েদের অন্য ডিপার্টমেন্টে যাওয়া মানা !
-আচ্ছা, আমি চলে যাচ্ছি । গেটের বাইরে তো দাঁড়ানো যাবে । নাকি?
মেয়েটা পেছনে হাটতে যাবে তখনই আমি বললাম,
-অন্যের ডিপার্টমেন্টে যেমন ঢুকে পড়তে নেই তেমনি অন্যের ভালবাসার মানুষের জীবনেও ঢুকতে নেই । এটা জানেন না ?
মেয়েটা আমার কথা শুনে থমকে দাঁড়ালো । তারপর আবারও আমার দিকে ফিরে তাকালো । বলল,
-কি বললেন ?
-ঠিকই শুনেছেন । নিলয় ? সে আমাকে ভালবাসতো ! আমাকে ।
দেখলাম মেয়েটা কেমন স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । একটা কথাও আর বলল না। তবে আমি মেয়েটার চোখের কোনে একটা সূক্ষ্ণ অশ্রুর কণা দেখতে পেলাম ! আমি আবার বললাম,
-নিজের দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছেন কি? নিলয় কেন আপনাকে ভালবাসবে? কোনদিন বাসবে না । কেবল ভাগ্যের জোরে ওকে বিয়ে করেছেন কিন্তু ও সারাজীবন আমাকেই ভালবাসবে !
এবার আমি সত্যিই দেখলাম যে মেয়েটা কেঁদেই ফেলল । আর দাঁড়ালো না । সোজা পেছন ঘুরে দ্রুত হাটতে লাগলো । আমার কেন জানি শান্তি শান্তি লাগলো খুব । কাজটা ভাল হল কি খারাপ হল সেটা আমি জানি না । আমি কেবল অনুভব করলাম যে আমার ভাল লাগছে কাজটা করতে পেরে !
|
|
চলবে.....??
