গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (১৮)

 


নিলয়ের কথাঃ


-তার মানে বলতে চাও তুমি বিবাহিত ?


আমি ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারছিলাম যে সে আমার কথা বিশ্বাস করে নি । জানতাম বিশ্বাস করবে না । বাড়িওয়ালারা এমনিতেই একটু সন্দেহপ্রবণ হয় । যাকে তাকে ভাড়া দিতে চায় না !


আমি একটু হাসি হাসি মুখ করে পকেট থেকে আমার বিয়ের কাবিননামা বের করে দিলাম । আমি আগে থেকেই জানতাম যে এই রকম একটা প্রশ্ন করা হবে আমাকে !


বাড়িওয়ালা সেটা কিছু সময় মন দিয়ে পড়লো ! সে কিছু বলতে পারে তার আগেই আমি বললাম,


-আপনি বলেছেন যে ব্যাচেলর ভাড়া দিবেন না । আমি সত্যিই যে ব্যাচেলর নই এটা তারই প্রমাণ । আপনি চাইলে আমার বাবার সাথে কথা বলতে পারেন । আমাদের বিয়ের ছবি এবং ভিডিও দেখতে পারেন । দেখাবো ? আমার মোবাইলেই কিছু আছে !


এই ভদ্রলোকের বাড়ির চিলেকোঠাটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে । ছাদের উপর দুটো ছোট ছোট রুম । একটা রুম একেবারেই ছোট । কেবল একটা সেমিডাবল খাট কোনরকমে ফিট হয় । তারপর হয়তো হাটার একটু জায়গা থাকবে । অন্য রুমটা তুলনামূলকভাবে একটু বড় । এখানে নানান জিনিসপত্র রাখা যাবে । পড়ালেখা শেষ হয়ে আসছে । ভাবছি আর হলে থাকবো না । আর তৃষার অপারেশনের ব্যাপারটার পরে আমার কেন জানি মনে হয়েছে যে কেবল হলে থাকাটা এখন আর পোষাবে না । যদি আগে থেকেই আমার এমন একটা বাসা থাকতো তাহলে ওকে হলে না নিয়ে গিয়ে এই বাসায় নিয়ে আসতে পারতাম ।


বাড়িওয়ালা ভদ্রলোক আরও বেশ কিছু প্রশ্ন করলো আমাকে । এবং আমার মনে হল যে সে সন্তুষ্টই হল । তবে এই শর্ত দিল যে আমার বউকে নিয়ে আসতে হবে একদিন । আমার বাবার মোবাইল নম্বর নিয়ে নিল । কথা বলবে বলে জানালো ! আর বলল যে আমি চাইলে আজকালের মধ্যেই উঠে পড়তে পারি । তবে একদিনের নোটিশে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে যদি আমার আচরণে সে কোনরকম সমস্যা দেখতে পায় । আমি সেটা নিশ্চিত করে চিলেকোঠাটা ভাড়া নিয়ে নিলাম !


জানি না কেন মনের ভেতরে আলাদা একটা আনন্দ হচ্ছিলো । যখন তৃষার সাথে আমার বিয়ে হল, আমি নিশ্চিত ছিলাম যে ওর সাথে আমার বিবাহিত জীবনটা ভাল কাটবে না । সামনের জীবনে আমরা কেউই সুখী হব না । আমাদের বাসররাতেও আমি সেটারই ইঙ্গিত পেয়েছিলাম। মেয়েটা কি তীব্র এক অভিমান নিয়ে আমাকে বলেছিলো যে আমাদের মাঝে কোনদিন কিছু স্বাভাবিক হবে না । অথচ মেয়েটা দিন দিন কিরকম যেন আমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে । এইবার বাসায় গিয়ে আমি সেটা বেশ ভাল করেই বুঝতে পারলাম । গাড়ি থেকে যখন ওকে হুইল চেয়ারে করে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো তখন ওর চেহারায় আমি একটা আলতো হতাশা দেখতে পেলাম । আমাকে কেউ বলে দিল না তবে আমার কেন জানি মনে হল যে হলে আমি ওকে ঠিক যেভাবে নিয়ে গিয়েছিলাম কিংবা সেদিন সকাল থেকে যেভাবে কোলে করে গাড়িতে উঠিয়েছিলাম, তৃষা ঠিক সেইরকমভাবেই বাড়ির ভেতরে যেতে চেয়েছিলো । সেটা না হওয়াতে খানিকটা হতাশ হল যেন !


আমার মনে মনে কেন জানি মজা লাগছিলো খুব ! সেই সাথে হাসছিলামও ! সুযোগ পেলে ওকে আমি আবারও কোলে নিয়ে নিবো !


আমি নিজেও কি এগিয়ে যাচ্ছি না ? এই যে আমি এই চিলেকোঠাটা ভাড়া নিলাম, এটা তো তারই প্রমাণ । ওর কাছাকাছি থাকার ইচ্ছে, ওকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছে ! আমি নিজেও ভেবেছিলাম হয়তো আমি কোনদিন নীতুকে ভুলে অন্য কাউকে ভালবাসতে পারবো না । কিন্তু সেটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে । আমার মন থেকে নীতুর চিন্তা একেবারেই চলে গেছে । যা আছে সেটা কেবলই একটা অস্বস্তি আর অপরাধবোধ । কিন্তু এই অপরাধটুকু আমি নিজে করি নি । এই পরিস্থিতির জন্য আমি নিজে দায়ী নই । এখন কেবল আমাকে এই কথাটা নীতুকে বলতে হবে । অবশ্য আমি ওকে কোনদিন কোন কথা দেই নি । আমাদের মাঝে সেই সুযোগের সৃষ্টিও হয় নি । তাই আমি নিজেকে ঠিক অপরাধীও ভাবতে পারছি না !


আমি অন্তত ইদানিংকালের সম্পর্কগুলোর মত কিছু তো করি নি । এখন মেয়েরা ছেলেকে কথা দেয়, বলে যে তাকে ভালবাসে, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালবাসবে না, ঘর বাঁধবে না। তারপর ছেলেটা যখন সময়মত চাকরি পায় না তখন অন্য ছেলের গলায় ঝুলে পড়ে ! আমার কাছে এটা প্রতারণা । আমি অন্তত এমন কিছু করি নি । তারপরেও একটা অপরাধবোধ আমার ভেতরে কাজ করছে । নীতুর সাথে এই ব্যাপারে আমার কথা বলতে হবে !


আমি রাস্তায় বের হয়ে এলাম । তৃষার বাবার ফোন এসে হাজির হল একটু পরে । আমি হলের দিকে যাবো ভাবছিলাম । ফোনটা দেখে আমার মনের ভেতরে খানিকটা ব্যাকুলতা সৃষ্টি হল । আবারও কি তৃষার কোন বিপদ হল ? আমি দ্রুত ফোন ধরলাম । সালাম দিয়ে কথা শুরু করলাম । শশুর মশাই বললেন,


-বাবা কাজে ব্যস্ত নাকি ?


-না না । কোন ব্যস্ততা নেই ।


-হলেই আছো ?


-না ঠিক হলে নেই । তবে ঐদিকেই আসবো এখনই ।


-আচ্ছা শুনো, এইদিকে আসতে হবে না । আমি ঢাকাতে এসেছিলাম কিছু মালপত্র কিনতে । কেনাকাটা শেষ । সেগুলো গোছাতে কিছু সময় লাগবে । ভাবলাম তোমাদের দুজনের সাথে কিছু সময় কাটিয়ে যাই । আমি তৃষাকে নিয়ে .....ঐ যে তোমাদের এখানে একটা বড় শপিং মল আছে না কাউরানবাজারে !!


-জি জি, বসুন্ধরা সিটি !


-হ্যা, ওখানেই যাচ্ছি আমি । তুমিও চলে আসো । কেমন !


-জি, আমি এখনই রওয়ানা দিচ্ছি ।


আমার বসুন্ধরা সিটিতে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগলো না । আমাদের বিয়ের পর শ্বশুরমশাই ঢাকাতে এই প্রথম আসলেন । আমাদের নানা দোকানে নিয়ে যেতে লাগলেন । বিশেষ করে আমাকে । ওয়েস্টিন থেকে শার্ট কিনে দিলেন । তৃষাকেও নানান রকম জিনিসপত্র কিনে দিলেন। আমাদের লাঞ্চও করালেন । আরও কত গল্প গুজব !


আমার তখনই মনে হল যে প্রথমবার তিনি ঢাকাতে এসেছেন । আমার তাকে কিছু দেওয়া উচিৎ ! এমন কিছু যাতে তিনি খুশি হন ! আরও কিছুটা ঘোরাঘুরি করতে শুরু করলাম। তখনই দেখতে পেলাম পাঞ্জাবীটা । দামটা দেখে খানিকটা দমে যেতে হল । আমার কাছে এতো টাকা নেই । আগে জানলে বাসা থেকে টাকা নিয়ে বের হতাম । কি করবো সেটা বুঝতে পারছিলাম না । অন্য জিনিস এখন আর আমার পছন্দও হবে না ।


একটু সুযোগ বুঝে তৃষাকে বললাম,


-আচ্ছা, তোমার কাছে হাজারখানেক টাকা হবে কি ?


তৃষা একটু বিস্ময় নিয়ে তাকালো আমার দিকে । ঠিক বুঝতে পারছে না আমি ওর কাছে টাকা কেন চাইলাম !


তৃষা বলল,


-টাকা ?


-হুম ! ঐ যে অঞ্জনস এ একটা ভাল পাঞ্জাবী দেখেছি । আব্বাকে ভাল মানাবে । কিন্তু আমার কাছে আসলে এতো টাকা নেই । বাসায় রয়েছে । আমি ক্যাম্পাসে গিয়েই তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি!


তৃষার চেহারাতে আমি একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম । মুখটা কেমন যেন মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে গেল । ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিল ।


আমাদেরকে রেখে শ্বশুরমশাই একটু ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন তখনই আমি পাঞ্জাবীটা কিনে ফেললাম । তৃষা পাশেই ছিল । আমি যখন শ্বশুরমশাইকে পাঞ্জাবীটা উপহার দিলাম, তিনি বেশ অবাক হলেন । আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,


-আরে কি আশ্চর্য ! তুমি এখন মাত্র পড়াশুনা কর, এখন কেন উপহার দিচ্ছো !


-আর আব্বা, প্লিজ এটা নিন !


-আরে না না ! এটা কোথা থেকে নিয়েছো দেখি আমি ...।


তৃষা বলল, আব্বু নাও । ও যখন দিচ্ছে নাও !


দেখলাম শ্বশুরমশাই আর মানা করলেন না ।


আমরা বিকেলবেলা ক্যাম্পাসের দিকে ফিরে গেলাম । আমাদেরকে আরও নানান কথা বলে শ্বশুরমশাই ফেরৎ গেলেন । এখান থেকে যাবেন পুরান ঢাকার দিকে । সেখান থেকে ট্রাক নিয়ে গ্রামে । আমি সাথে যেতে চাইছিলাম তবে তিনি মানা করলেন । বললেন আমার এখানেই থাকা দরকার । আমি এখানে থাকলেই নাকি তিনি নিশ্চিত থাকবেন । তার মেয়ে নিরাপদ থাকবে !


কথাটা শুনে আমার নিজের কাছে এতো ভাল লাগলো আমি বোঝাতে পারবো না । মেয়ের বিয়ের পরে প্রতিটি বাবাই তার মেয়ের জামাইকে সব থেকে কাছের আর ভরশার মানুষ মনে করে । সে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে সে না থাকলেও তার মেয়ের সকল দায়িত্ব এই ছেলেটা পালন করবে । সে যেমন করে তার মেয়েকে দেখেশুনে রেখেছে তার মেয়ের জামাই ঠিক একইভাবে তার মেয়েকে দেখেশুনে রাখবে। অবশ্য অনেক মেয়ের জামাই সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারে না ।


তৃষার বাবা চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুটা সময় আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম ওর হলের সামনে । দুজনের কেউই এখান থেকে চলে যেতে চাইছি না আবার সেটা বলতেও পারছি না । শেষে তৃষাই আমার দিকে তাকিয়ে বলল,


-টাকাটা ফেরৎ দিতে হবে না !


আমি বললাম,


-সে কি কেন ?


-এমনি । যা বলছি শোন !


-আচ্ছা ! আর কিছু বলবা ?


-না । সাবধানে যাও ।


আমার দিকে তাকিয়ে ও আবারও হাসলো । আমার ওর হাসিটা এতো পছন্দ হল আমি বলে বোঝাতে পারবো না । ওর হলের গেট দিয়ে ঢোকার আগ পর্যন্ত আমি সেদিকেই তাকিয়ে রইলাম । আমার মনে এতো আনন্দ অনুভূত হচ্ছিলো যে সেটা আমি কিছুতেই বলে বোঝাতে পারবো না । এমন একটা ব্যাপার কোনভাবেই বলে বোঝানো যাবে না । কেবল আমিই না, তৃষাও যে আমার প্রেমে পড়েছে সেটা আমাদের দুজনেই খুব ভাল করে বুঝতে পারছিলাম ।


নিজের হলের দিকে হাটতে শুরু করলাম । কিছু সময় হাটার পরই আমার মনে হল কেউ যেন আমার পেছন পেছন আসছে । পেছন ফিরে তাকাতেই খানিকটা অবাক হলাম আমি।


নীতু !!

|

|

চলবে.....??

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url