গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (১৭)
সূচির কথাঃ
ফয়সাল ওর বাবাকে খুব ভালবাসতো । ব্যাপারটা যত টা না ভয়ের ছিল তার থেকেও বেশি ছিল সম্মানের । আমাকে নিয়ে সে সুখে ছিল । আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে ওকে সুখী করার চেষ্টা করেই যাচ্ছিলাম তবে আমার মনের মাঝে একটা সংকোaচ বোধ সব সময় কাজ করেই যাচ্ছিলো । আমি যতবারই ওর চেহারার দিকে তাকাতাম ততইবারই মনে হত যে ফয়সাল বুঝি একটা বিষন্নতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে । এবং এই বিষন্নতার জন্য আমি দায়ী । ও আজকে আমার কারনেই ওর পরিবারের কাছ থেকে বিছিন্ন ! যদি আমি ঐদিন ওভাবে ওকে চাপ না দিতাম তাহলে হয়তো আজ হয়তো ওর বাবার সাথে নিয়মিত কথা বলতো । আমার কারনেই ও ওর বাবা মায়ের কাছ থেকে আলাদা ।
ফয়সাল আমাকে ভালবাসতো এই ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই । সারা জীবন সে আমাকে ভালবাসবে সেটার ব্যাপারে আমি জানি । কিন্তু সাথে সাথে এও জানি যে ও সারা জীবন এই একটা কথা ভাববে যদি আমার সাথে বিয়ে না হত তাহলে তাহলে হয়তো ও ওর বাবা মা আর ভাইয়ের সাথে স্বাভাবিক যোগাযোগ রাখতে পারতো !
ফয়সালের ভাই নিলয়কে আমি আগে থেকেই চিনতাম । যদিও কোন দিন কথা হয় নি আমাদের মাঝে । ফরসালের সাথে বিয়ের পর ওকে আরও ভাল করে চিনতে পারলাম । ফয়সালের সাথে যে মেয়েটার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সেই মেয়েটার সাথে নিলয়ের বিয়ে হয়েছে । ঐ সময়ে ফয়সলাকে নিয়ে আমি যখন পালিয়ে এসেছিলাম, নিলয় এগিয়ে এসেছিলো বাবার সম্মান বাঁচাতে । তানভিরের জন্য আমার মন খারাপ হল খানিকটা । বেচারার উপর দিয়ে এখন কি অতিবাহিত হচ্ছে সেটা আমি ঠিকই বুঝতে পারছিলাম । আমার মনের মাঝে অপরাধবোধটা বুঝি আরও একটু বেড়ে গেল । আজকে ওদের দুই ভাইয়ের এই অবস্থার জন্য কেবল মাত্র আমি নিজে দায়ী । কিন্তু এখানে আমার কিই বা করার আছে ? আমি কি আমার ভালবাসার মানুষটাকে পাওয়ার চেষ্টা করবো না ? অবশ্যই চেষ্টা করবো।
আমি ফয়সালকে বলেছিলাম যাতে সে নিলয়কে বাসায় আসতে বলে । ভাইয়ে ভাইয়ে মিল ছিল বেশ । এটা দেখে আমার ভাল লাগতো । আর এটাও লক্ষ্য করতাম যে নিলয় এই বাসায় আসলেই ফয়সাল বেশ খুশি হত । তাই মাঝে মধ্যেই ওকে বাসায় আসতে বলতাম । আমি প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো ও আমাকে ঠিক পছন্দ করবে না । হাজার হলেও আজকে ওর এই পরিস্থিতির জন্য আমি খানিকটা হলেও দায়ী । কিন্তু নিলয়ের মাঝে সেই আচরন দেখতাম না । আগেই বলেছি যে দুই ভাইয়ের মাঝে বেশ মিল রয়েছে। সেই সুবাধে আমাকে সে পছন্দই করলো ।
একদিন আমি নিলয়কে ওর বউ সহ দাওয়াত দিতে চাইলাম । ফয়সাল আমার দিকে তাকিয়ে বললাম, কাজটা কি ঠিক হবে ? মানে নিলয়ের বউ তৃষার সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল । মেয়েটা কি স্বাভাবিক ভাবে নেবে ?
আমি বললাম, এটাই তো ! আমি চাই মেয়েটার সাথে তুমি কথা বল। যা ঘটে গেছে তা আমরা কেউ বদলাতে পারবো না । কিন্তু একটু কথা বলে সব কিছু স্বাভাবিক করে নেওয়া যায় । চেষ্টা করলেও হবে । মেয়েটা হয়তো তোমাকে ভুল বুঝে বসে আছে । তুমি কথা বলে সেটা দুর করে দাও । ফয়সাল বেশ কিছু সময় ভাবলো । তারপর বলল, হ্যা ঠিকই বলেছো । কথা বলাই উচিৎ !
এক ছুটির দিনে নিলয় আর ওর বউ আমাদের বাসায় একদিন এসে হাজির হল । আমিই তৃষাকে আগে আপন করে নিলাম । মেয়েটা প্রথম প্রথম খুব সংকোচ করে বসে ছিল । একটা সুযোগ মত আমি নিলয়কে বাইরে পাঠিয়ে দিলাম । তারপর নিজেও সরে এলাম । ফয়সাল কথা বলুক । মেয়েটার সংকোচ কেটে যাক ।
ঐদিনের ঘটনার পরে ফয়সালকে দেখতে পাচ্ছিলাম বেশ ভাল মেজাজে আছে । মনটা ওর ভালই থাকতো সারা দিন । এটা নিয়ে আমার খব ভাল লাগতো । আমি চেষ্টা করতাম যেন ওদের দুই ভাইয়ের মাঝে যোগাযোগ বেশি বেশি হয় । তাহলে ফয়সাল হয়তো আরও ভাল থাকবে !
কিন্তু একদিন ঘটলো সব থেকে আশ্চর্যের ঘটনা ! আমরা রাতে ঘুমিয়ে ছিলাম । রাত তখন কটা বাজে কে জানে । হঠাৎ ফয়সালের ফোন বেজে উঠলো । আমারও ঘুম ভেঙ্গে গেল । ফয়সাল ঘুম জড়ানো চোখে নম্বরটি দেখতেই তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠলো । আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে । ও কেবল কিছু সময় জি জি জি করলো ! তারপর ফোন কেটে দিল । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তখন ভোর চারটা বাজে । আমি বললাম, কি হয়েছে? কে ফোন দিয়েছে ?
ফয়সাল আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা ফোন দিয়েছে ?
-কি বললে ?
-হ্যা !
-কি বলল?
-আমাদের বাসার ঠিকানা মেসেজ করতে বলল মনজুর কে !
-মনজুর ?
-আমাদের ড্রাইভার ! আর বলল যে আমরা যেন রেডি থাকি । মনজুর ছয়টার ভেতরেই চলে আসবে আমাদের নিতে !
আমার কথাটা ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিলো না । ফয়সালের বাবা আমাদেরকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি পাঠাচ্ছে । ফয়সাল হঠাৎ আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো । তারপরই আমি অনুভব করলাম ও কাঁদছে । এতো বড় একটা ছেলে এভাবে কেঁদে উঠবে আমি কখনও বুঝতেই পারি নি । তবে এ কান্না আনন্দের কন্না ! তীব্র আনন্দের কান্না !
আমরা ফয়সালদের বাসায় পৌছালাম সকাল বেলা । তখন সবাই খেতে বসে সম্ভবত । বিশাল বড় উঠন পেরিয়ে ওদের মুল বাড়ি শুরু হয় । আমরা আঙ্গিনাতে ঢুকতেই দেখলাম একজন মাঝ বয়সী রাশভারী লোক বেরিয়ে এল । ইনিই যে ফয়সালের বাবা সেটা বুঝতে কষ্ট হল না। তার পেছনে নিলয় আর তৃষাকে বের হয়ে আসতে দেখলাম ! তার পেছনে এক মাঝ বয়সী মহিলা !
আমি কেবল বোকার মত তাকিয়ে ছিলাম । কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । বারবার মনে হচ্ছিলো আমি স্বপ্ন দেখছি । সত্যিই স্বপ্ন দেখছি । আজকে এতোদিন পরে আমার মনের ভেতরে সে অপরাধবোধ টুকু ছিল সেটা দুর হতে শুরু করলো । এখন আমি নিজেকে খানিকটা মুক্ত অনুভব করলাম !
আমি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম শশুর মশাই এর দিকে, আগে সালাম করা যাক। পরের চিন্তা পরে।
|
|
চলবে.....??
