গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (১৬)
তৃষার কথাঃ
ঢাকায় আসার পর থেকে আমি খুব একটা বাইরে বের হইনি কখনই । আমি দেখতাম আমার পরিচিত সবাই কাজ না থাকলে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতো । আর একটু চোখ কান ফুটে যাওয়ার পরপরই বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে ফেলত । তারপর তাদের নিয়েই তাদের জগত । আমার অবশ্য তাতে খুব একটা খারাপ লাগতো না । ভালবাসার মানুষের সাথে ঘুরে বেড়ানোটা মোটেই খারাপ কিছু না । ভালবাসার মানুষের সাথে সময় কাটাতে কে না চায় ! আমিও তাই চাইতাম । তবে সাহস করতাম না । বারবার মনে হত আমি যদি কাউকে ভালবাসি তাহলে একটা সময় সে ঠিকই জেনে যাবে আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা । তারপর আমাকে ছেড়ে চলে যাবে । নয়তো অপবাদ দিবে আমার নামে । আমার কত কাছের মানুষের মুখেই এই কথাগুলো আমি শুনেছি । তাদের কথা হচ্ছে, দুনিয়ার অন্য কোন মেয়েকে তো তুলে নিয়ে যায়নি, আমাকেই কেন তুলে নিয়ে গেল ! নিশ্চয়ই আমার ভেতরেই দোষ আছে ।
প্রথম যেদিন এই কথাটা আমি শুনেছিলাম মনে হয়েছিলো যেন আমি মাটির সাথে মিশে গিয়েছি। এমন একটা ব্যাপার আমার সাথে সেই ছোটবেলাতেই ঘটে গেল ! আমি তখন ঠিকমত কিছু বুঝিও না, জানিও না । আর আমাকেই কি না দোষ দেওয়া হচ্ছে ! এজন্যই আমি মানুষের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতাম । কাছের মানুষগুলোর কাছ থেকে এই কথাগুলো শুনতে মন চাইতো না । এর থেকে বরং আমি দূরে দূরে থাকি !
তবে অনেকদিন পরে আমার কেন জানি শান্তি শান্তি লাগছিলো । আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন সবাই ব্যাপারটা জানে । তারা এটা জেনেই আমাকে কাছে টেনে নিয়েছে । বিশেষ করে আমার শ্বশুরমশাই এতো গভীরভাবে আমাকে আপন করে নিয়েছেন যে আমি সত্যি ভাবতেই পারছি না । আমি কোনদিন ভাবিও নি আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এমন হবে । আমি ভেবেছিলাম যদি কোনদিন আমার বিয়ে হয় তাহলে হয়তো উঠতে বসতে স্বামী, শ্বশুর কিংবা শ্বাশুড়ির কাছ থেকে আমাকে খোঁটা শুনতে হবে ।
আমার পায়ের ঐ সামান্য কাটার জন্য আমাকে কিভাবে বাসায় নিয়ে গেল । একটানা পুরো তিনদিন আমাকে একদমই বিছানা থেকে উঠতে দেয় নি । আমার কখন কি দরকার সব সাথে সাথে আমার হাতের কাছে হাজির হয়েছে । আমি কোন কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি । তবে মনের ভেতরে একটা ভয় ঠিকই কাজ করছে আস্তে আস্তে । এই সুখ আমার কপালে সইবে তো !
এজন্যই আমি সুখের সাথে অভ্যস্ত হতে পারি না । চাইও না । কারণ সুখের সাথে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার পর যখন সেটা কাছ থেকে চলে যায় তখন সেই কষ্টটার সাথে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না !
নিলয়দের বাসায় থাকার সময় একদিন আমি সাহস করে আমার শ্বশুরমশাইকে প্রশ্নটা করে ফেললাম । সেদিন বিকেলবেলা আমার পা অনেকটাই ভাল হয়ে গেছে । তারপরেও শ্বশুরমশাই আমাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেছেন । আশেপাশে কাউকে না দেখে আমি হঠাৎ জানতে চাইলাম,
-একটা কথা জানতে চাইবো বাবা ?
-হ্যা বল !
-আমার ব্যাপারটা কি নিলয় জানে ?
আমার প্রশ্ন শুনে একটু যেন থমকে গেলেন তিনি । তারপর আবার চলতে শুরু করলেন । তারপর বললেন,
-আমি এখনও ওকে বলি নি । তবে এটা কোন বড় ব্যাপার না ।
-ওকে কি বলা দরকার না ?
-আমি আমার ছেলেকে চিনি । আমার ঠিক যেমনটা মনে হয়েছে নিলয়েরও ঠিক তেমনটাই মনে হবে ! ফয়সালের এমনটাই মনোভাব হত !
আমি বললাম,
-হ্যা, তারও একই মনোভাব !
বলেই মনে হল আমি ভুল করে ফেললাম । আমি নিলয়ের মুখে শুনেছিলাম যে ফয়সালকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে । শ্বশুরমশাইয়ের কড়া নির্দেশ, তার সাথে এই বাড়ির কারো কোন সম্পর্ক থাকবে না । আমার শ্বশুরমশাই দাঁড়িয়ে গেলেন আবারও । তারপর গম্ভীরকন্ঠে বললেন,
-তোমরা দেখা করেছিলে তার সাথে ?
-জি বাবা ।
-কেন করেছিলে ?
আমার এখন কি বলা উচিৎ আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না । তবে কেন জানি মনে হল আমি চাইলেই এই সমস্যাটার সমাধান হবে । আমি হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে গেলাম । একটু ব্যথা অনুভব হল বটে তবে সেটা আমলে নিলাম না ! শ্বশুর মশাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-আপনি রাগ করবেন না প্লিজ ! দেখুন, যা হওয়ার হয়েছে ! আমি এসবের কিছু মনে রাখি নি । রাখতে চাই না । তার উপর আমার রাগ নেই । আপনিও রাগ রাখবেন না । ভাইয়াকে মাফ করে দিন !
শ্বশুরমশাই আমার চোখের দিকে তাকালেন । আমি এবার সব থেকে সাহসের কাজটা করলাম । বললাম,
-আপনি যদি ভাইয়া আর ভাবীকে মেনে না নেন তাহলে আমিও এই বাড়িতে আর আসবো না। আমার মনে হবে কেবল আমার কারণে এই বাড়ির এক ছেলেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে !
আমার কাছ থেকে সম্ভবত তিনি এইরকম কথা আশা করেন নি । আমাকে ওখানে রেখেই তিনি ঘরের দিকে হাটা দিলেন । আমি হুইল চেয়ারে বসে পড়লাম । বারবার মনে হল যে আমি সম্ভবত একটু অতিরিক্ত করে ফেলেছি । এই কথাটা বলা মোটেই ঠিক হয় নি ।
সারাদিনে শ্বশুরমশাইয়ের দেখা পেলাম না আর । আমার একটু মন খারাপ হল । আগের দিনগুলোতে আমার ঘরে তিনি কয়েকবার করে আসতেন কিন্তু ঐদিন আমার কাছে একবারও এলেন না । নিলয় মাঝে একবার এসে আমার সাথে দেখা করে গেল । তবে আমার মন খারাপই হয়ে রইলো !
পরদিন সকালবেলা ঘটলো সব থেকে আশ্চর্যের ঘটনা । সকালে নাস্তা খেতে বসার আগেই দেখলাম বাড়ির গাড়িটা এসে থামলো আঙ্গিনাতে । এবং আমাদের চমকে দিয়ে সেখান থেকে ফয়সাল ভাইয়া আর সূচী ভাবী নামলো । আমরা সবাই কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছি সেদিকে । নিলয় এবং আমার শ্বাশুড়ি বিস্মিত চোখে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে । কোনভাবেই তাদের এখন এই বাসায় আসার কথা না ।
শ্বশুরমশাই আমার সামনে এসে বললেন,
-আজ পর্যন্ত আমার উপর জোর খাটিয়ে কেউ কোন কিছু করাতে পারে নাই । কিন্তু তুমি করালে । আর আমিই বা এমন কেন করলাম আমি নিজেই জানি না ।
আমার এতো আনন্দ হল যে আমি তাকে জড়িয়েই ধরলাম ! আমার মনে হল যে আমি আমার নিজের বাবাকেই জড়িয়ে ধরেছি। সেদিন পুরো পরিবার প্রথমবারের মত একসাথে খেতে বসলাম । আমার এতো আনন্দ হচ্ছিলো ! উপরওয়ালাকে বারবার ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম ।
আমার মনের ভেতরে তখন সেই ভয়টা আবারও বাড়তে শুরু করেছে । আচ্ছা নিলয় যদি ঘটনাটার কথা জানতে পারে তখন সে কি মনে করবে? সে কি আমাকে ভুল বুঝবে ? আমার কি ওকে আগে থেকেই বলে দেওয়া উচিৎ এই কথাগুলো ?
আমি এটা ঠিকই বুঝতে শুরু করেছি যে নিলয়কে আমি পছন্দ করতে শুরু করেছি । আর নিলয়ও যে আমার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে সেটাও বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো না আমার । তবে আমাদের মাঝে এখনও একটা সংকোচ রয়েই গেছে । একটা দেওয়াল আমাদের মাঝে এখনও দাঁড়িয়ে আছে ।
আমার পায়ের কারণে আমাকে নিলয়ের সাথে ঘুমাতে হয় না । যদিও আমি নিলয়ের ঘরেই ঘুমাই, নিলয় অন্য ঘরে ঘুমায় । একজন কাজের মেয়ে থাকে আমার সাথে । ঐদিন ঘুমানোর আগে হঠাৎ নিলয় নিজের ঘরে এল কি একটা জিনিস নেওয়ার জন্য । আমার পা প্রায় ভাল হয়ে গেছে । হাটতে গেলে একটু চাপ লাগে কেবল । নিলয় আমার পায়ের খবর নিয়ে আবারও ফিরে যাচ্ছিলো তখন আমি ওকে বললাম, শোন
-হুম !
-তোমাকে একটা কথা বলার ছিল ।
নিলয় সোফার উপর বসলো । তারপর বলল,
-বল
-আসলে আমি জানি না তুমি কিভাবে নেমে ব্যাপারটা ।
-বল । দেখা যাক কিভাবে নেওয়া যায় ।
আমি জোরে করে একটা দম নিলাম । তারপর বললাম,
-আসলে আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন আমার সাথে ..।
-একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিলো ! এই তো ? ....
আমি তীব্র বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলাম । নিলয় এমন একটা ভাব করলো যেন এটা কোন ব্যাপারই না । সব থেকে বড় কথা হচ্ছে সে ব্যাপারটা জানে । আমি বললাম,
-তুমি জানো ?
-হ্যা ।
-বাবা বলেছেন ?
-না ।
-আমার আব্বু বলেছে?
-নাহ !
-ভাইয়া বলেছে কি ?
-ভাইয়া জানে নাকি ?
আমি এবার খানিকটা বিস্মিত হলাম । এরা ছাড়া আর কে বলবে ওকে ! আমি বললাম,
-কে বলেছে ? মানে কিভাবে জানো তুমি ?
নিলয় একটু হাসলো । তারপর বলল,
-একজন ফোন করে জানিয়েছিলো ।
আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমার ওকে আরও আগেই জানিয়ে দেওয়া উচিৎ ছিল । আমি বললাম,
-আমাদের বিয়ের দিন ?
-না । দুদিন পরে । মানে যখন বিয়ে হয়ে গেছে আর কি ! সম্ভবত এই মেয়ের কাজই হচ্ছে সবাইকে এই খবর জানানো । তাই না ? এইজন্য সম্ভবত তোমার আগের বিয়েগুলো ভেঙ্গেছে।
আমি আরও একটু অবাক হয়ে বললাম,
-মেয়ে ?
-হ্যা মেয়ে ! এবং আমি জানি মেয়েটা কে !
-কে ?
-বললে বিশ্বাস করবে?
-করবো । বল কে ?
নিলয় একটু যেন চিন্তা করলো । তারপর বলল, তোমার প্রাণের বান্ধবী সিমু !
আমি ওর দিকে কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । আমার ঠিকমত বিশ্বাস হল না কথাটা । নিলয় বলল,
-মনে আছে তোমাদের বাসায় যখন বিয়ের ফিরানিতে গিয়েছিলাম তখন সিমু আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলো ?
-হ্যা ।
-তখন ওর সাথে আমার কথা হয়েছিলো । ওর কন্ঠস্বর আমি ফোনের ভেতরে চিনতে পারি । পরে আমিই ওকে ফোন দিই এবং ওর নাম ধরে ডাকতেই ও ভয় পেয়ে যায় । স্বীকার করে নেয় যে ঐ সব সময় পাত্রপক্ষকে বলে দিতো ফোন করে !
আমার ব্যাপারটা হজম করতে সত্যিই বেশ কষ্ট হচ্ছিলো । সিমুকে আমি কত বিশ্বাস করতাম, কত পছন্দ করতাম । আমি আবারও নিলয়ের দিকে তাকালাম । নিলয় বলল,
-তোমার মনে প্রশ্ন জাগছে যে কেন এমনটা করলো সে । তাই না ?
-হ্যা ।
-আসলে সে সবসময় তোমাকে ঈর্শ্বা করে এসেছে । তুমি দেখতে সুন্দর, তোমার ফ্যামিলি ভাল, পড়াশুনার সুযোগ ভাল । কেন তুমি সবসময় সব পাবে !
নিলয় এবার উঠে এসে আমার বিছানার পাশে বসলো । আমার কাছে এসে বলল,
-আমি এটা তোমাকে বলতে চাই নি পাছে তোমার মন খারাপ হয় । হাজার হোক বন্ধু মানুষ তো । তাই না ?
আমি কোন কথা বলতে পারলাম না আর । নিলয় আমাকে এসব নিয়ে আর ভাবতে মানা করলো । ও চলে যেতেই আমার একই সাথে খারাপ আর ভাল লাগতে শুরু করলো । খারাপ লাগলো সিমুর কথা ভেবে । আমি কোনদিন ভাবি নি সিমু এমন একটা কাজ করবে । আর ভাল লাগলো এটা ভেবে যে নিলয় আমার দুর্ঘটনার ব্যাপারটা এমনভাবে নিয়েছে যেন এটা কোন ব্যাপারই না । ঘুমানোর আগে অনুভব করলাম যে বুকের ভেতর থেকে আরেকটা অস্বস্তির অনুভূতি কেটে গিয়েছে । আমি হয়তো আরও একটু এগিয়ে গিয়েছি নিলয়ের দিকে !
|
|
চলবে......??
