গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (১৫)
তৃষার কথাঃ
নিলয়ের দিকে তাকাতে আমার কেন জানি একটু লজ্জা করছিলো । পরপর দুইবার সে আমাকে এইভাবে কোলে করে নিয়ে গাড়ি থেকে বাইরে বের করলো আবার ভেতরে নিয়ে গেল । আমার সবার সামনে এতো লজ্জা করতে লাগলো আমি নিজেই জানি না । গাড়ি ছাড়ার আগে নাহার আপার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখি সে কেমন মিটমিট করে হাসছে । কি একটা লজ্জার অনুভূতি !
আবার নিলয়দের ড্রাইভার ছেলেটাও কেমন নির্লজ্জের মত হাসছিলো । মনে হচ্ছিলো যেন কি একটা মজার দৃশ্যই না ও দেখছে । আচ্ছা, ওদের বাসায় গিয়ে যখন হাজির হব তখন কি হবে ?
ও কি তখনও আমাকে সবার সামনে কোলে করে নিয়েই ভেতরে যাবে ?
কথাটা মনে হতেই আমার পুরো শরীর খানিকটা কেঁপে উঠলো ।
এমন কিছু হলে আমি সত্যিই লজ্জাতে মরে যাবো ! এই কথাটা ভাবতেই আামর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো ।
ঠিক এইরকম লজ্জা আমি পেয়েছিলাম নিলয়ের বড় ভাইয়ের বাসায় গিয়ে । বিশেষ করে একটা সময় নিলয় টক দই আনতে বাইরে চলে গেল । সূচি ভাবী আবারও রান্নাঘরে গিয়েছে । আমি বসে আছি সোফাতে । তখনই ফয়সাল নামের মানুষটা আমার সামনে এসে বসলো । আমি তখন টিভির দিকে তাকিয়ে আছে । আমার কেন জানি মনে হল সূচি ভাবী ইচ্ছে করেই রান্নাঘরে চলে গিয়েছে । আমার সাথে ফয়সাল সাহেবের কথা বলার একটা সুযোগ করে দেওয়ার জন্য !
আমার ধারণা সত্যি হল একটু পরেই । ফয়সাল সাহেব বলল,
-তৃষা !
আমি তখনও তার দিকে তাকাই নি !
সে বলল,
-আমার তোমার কাছে একটা ক্ষমা চাওয়ার দরকার আছে । যদিও আমি এর কিছুই জানি না, আমাকে খানিকটা জোর করেই এর ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছিলো ।
আমি কোন কথা না বলে তার দিকে চোখ তুলে তাকালাম ।
ফয়সাল সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে আছে । সে আবার বলল,
-আমি ছোটবেলা থেকেই বাবাকে জমের মত ভয় পেয়ে এসেছি । তার কথার অবাধ্য হওয়ার সাধ্য আমার ছিল না কোনদিন । এই জন্যই হয়তো বাবা আর কোন কিছু না ভেবেই আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিলেন । আমি হয়তো সত্যিই তোমাকে বিয়ে করে ফেলতাম । ওভাবে পালাতাম না । কিন্তু সূচির সাথে আমার অনেকদিন আগে থেকেই একটা কমিটমেন্ট ছিল । আমি যদি তোমাকে বিয়ে করতাম তাহলে সূচি কি যে করতো আমি জানি না ! কেবল এই জন্যই ...
সে একটু বিরতি নিল । তারপর বলল,
-আব্বাকেও দোষ দিতে পারছি না কারণ আমিই তাকে এই অনুভূতিটা দিয়েছি যে আমি তার সব কথা শুনবো । এই জন্যই হয়তো সে আমার কাছে একবারও জানতে চান নি । তুমি প্লিজ আমার উপর কিংবা বাবার উপর রাগ রেখো না । কেমন ?
আমি একটু হাসলাম । ফয়সাল সাহেব বলল,
-নিজের ভাই বলে বলছি না তবে নিলয় ভাল ছেলে । একটু সময় হয়তো তোমাদের লাগবে তবে তুমি যদি একটু সাহায্য কর তাহলে দেখবে সে বেস্ট হাসব্যান্ড হবে !
আমি কি বলবো খুঁজে পাচ্ছিলাম না । আমার এখন কি বলা উচিৎ আমি নিজেও জানি না । এক হিসাবে দেখলে আসলে ফয়সাল সাহেবকে দোষও দেওয়া যায় না । সবাই আসলে পরিস্থিতির স্বীকার । আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিয়েছি । এর থেকে ভাল আর আমার জীবনে কি হতে পারতো ?
ফয়সাল সাহেব হঠাৎ বলল,
-তোমার স্কুল জীবনে কি কিছু হয়েছিলো?
আমার বুকের মাঝে ধ্বক করে উঠলো । আমি অস্বস্তি নিয়ে তাকালাম । আমার তাকানোর ধরণ দেখেই সে বুঝে গেল যে আমার সাথে কিছু হয়েছিলো ! ফয়সাল সাহেব বলল,
-বাবা নিশ্চয়ই জানে কথাটা । তাই না ?
আমি মাথা নাড়ালাম ! বললাম,
-আপনি বাবার কাছ থেকে শুনেন নি ?
-না ! আমাকে একজন ফোন করেছিলো ?
-কে ?
-সে তার নাম বলে নি । ফোন দিল আর হরহর করে সব বলে গেল ।
আমি মাথা নিচ করে রইলাম । ফয়সাল সাহেব বলল,
-আমি আমার বাবার মতই । যে অপরাধ তুমি কর নি তার জন্য তোমাকে দোষ দিবো না । আমি কেবল তোমাকে বলতে চাইছিলাম যে ঐ কথা জানা আর আমার পালিয়ে যাওয়ার ভেতরে কোন সম্পর্ক নেই । আমি কেবল আমার ভালবাসার মানুষটির জন্য চলে এসেছিলাম। তুমি দয়া করে আমাকে ভুল বুঝো না ।
আমার কেন জানি কথাটা ভাল লাগলো । ফয়সাল সাহেব হয়তো খানিকটা অপরাধবোধে ভুগছিলো । সে হয়তো মনে করে আছে যে আমি তাকে ভুল বুঝেছি । একটু যে বুঝেছিলাম সেটা সত্যি । আমার সত্যিই মনে হয়েছিলো যে ফয়সাল সাহেব আমার ব্যাপারে আগে জানতেন না । তারপর জেনে গিয়ে মাঝপথে পালিয়ে গেছেন । তবে এখন কেন জানি সত্যটা জেনে একটু ভাল লাগছে । যাক, অন্তত আমি যে অপরাধটা করি নি সেটার জন্য এখানে আমাকে শাস্তি পেতে হয় নি ।
ফয়সাল সাহেব বলল,
-নিলয় কি জানে ব্যাপারটা ?
বললাম,
-ঠিক জানি না !
-ওকে তুমিই বলে দিও । জানি না বাবা ওকে বলেছে কিনা । তবে তোমার কাছ থেকে শুনলে ভাল হবে । ঠিক আছে?
-জি ! আমার মনে থাকবে !
নিলয় হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-একটা কথা বলবো ?
-হ্যা বল !
-আব্বা মেয়েদের জিন্স পরাটা পছন্দ করে না !
আমি নিজের পরনের জিন্সটার দিকে তাকালাম ! গতকালই এটা পরে গিয়েছিলাম । তখনই আমার মনে হয়েছিলো যে এটা পরে না যাই । প্যান্টটা একটু টাইটমত । এটা সহজে খোলা যায় না । অন্য কিছু পরার মত ছিল না কাল । লন্ড্রিতে সব জামা কাপড় ছিল ।
আমি বললাম,
-আসলে আমি খুলতে পারি নি এটা পায়ের কারণে !
-বুঝতে পারছি ! আগে থেকে বলে রাখলাম ! যদিও তোমাকে কিছু বলবে না মনে হয় !
আমি একটু শঙ্কিতবোধ করলাম । বিয়ের পর প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি তাও আবার জিন্স পরে । ব্যাপারটা ভাল দেখায় না মোটেও । আসলে আমার কিছুই করার নেই এখানে । যাক, বকা শুনলে না হয় শুনলাম !
এইসব ভাবতে ভাবতেই দেখতে পেলাম আমরা পৌঁছে গেছি । আমার শ্বশুরমশাই বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়েছিলেন । বুঝতে কষ্ট হল না যে আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন ! সব থেকে অবাক লাগলো এটা দেখে যে তার পাশেই একটা হুইল চেয়ার রাখা ! মনটা কেন জানি হঠাৎ ভাল হয়ে গেল । আমার বাবা সবসময় আমার খেয়াল রাখতো । আমার কখন কি দরকার তা আগে থেকেই সে জানতো ! হুইল চেয়ারটা দেখে আমার মনে হল যে আমার এই বাবাও আমার সব ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন । আমার পায়ে অপারেশন হয়েছে এবং আমি হাটতে পারবো না এটা তিনি আগে থেকেই খেয়াল করে রেখেছেন এবং এই হুইল চেয়ারটা এনে রেখেছেন ! এটা ভাবতেই আমার মনটা খুব ভাল হয়ে গেল । মনের ভেতরের শঙ্কাটা কেটে গেল সাথে সাথেই । মনে হল যে তিনি মোটেই রাগ করবেন না !
আমাকে এইবারও নিলয়ই নামতে সাহায্য করলো ।
শশুরমশাই বললেন,
-পথে কষ্ট হয় নি তো ?
আমি একটু হেসে বললাম,
-না না । একদমই কষ্ট হয় নি ।
-আচ্ছা। আগে সকালের নাস্তা খাওয়া যাক । তারপর কথা শুনবো সবার ।
এই বলে তিনি আমার হুইল চেয়ারটা ধরতে গেলেন । তিনিই আমাকে ভেতরে নিয়ে যাবেন এমন একটা ইচ্ছে ওনার ! আমি বলতে গেলাম যে,
-বাবা আপনি নিয়ে যাবেন ?
শশুর মশাই বললেন,
-কেন? সমস্যা কি ? বাবা তার মেয়েকে নিয়ে যেতে পারে না ?
আমি লজ্জিত হয়ে বললাম,
-না, না আমি সেটা মিন করে কিছু বলি নি ।
-তাহলে চুপ করে থাকো !
তারপর আমার হুইল চেয়ারে ঠেলা দিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে লাগলেন !
কিন্তু যখন হুইল চেয়ারে উঠে আমি বাড়ির দিকে আসছিলাম তখন হঠাৎই আমার মনটা খানিকটা বিষণ্ন হয়ে উঠলো । আমি সত্যিই কারণটা বুঝতে পারলাম না । মনে হল আমি যেন কিছু একটা মিস করে গেলাম ! কি মিস করে গেলাম সেটা কিছুতেই আমার মাথার ভেতরে ঢুকলো না ।
করে গেলাম ! কি মিস করে গেলাম সেটা কিছুতেই আমার মাথার ভেতরে ঢুকলো না ।
এমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হওয়ার কারণ কি?
|
|
চলবে.....??
