গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (১৩)

 


নিলয়ের কথাঃ


রাত করে হলে পৌঁছানোটা আমার জন্য নতুন কিছু নয়। আজকে হলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে যাবে। এমনিতে দশটার ভেতরে গেট বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও, ছেলেরা প্রায় সারারাতই হল থেকে বের হতে পারে কিংবা ঢুকতে পারে। তবে আজকে হলে আমি ইচ্ছে করেই দেরি করে ঢুকেছি। রাত এগারোটা এখন। গেট আরও একটু দূরে। আমি হাটছি সেদিকে। তখনই আব্বার ফোন এসে হাজির।


-আসসালামু আলাইকুম আব্বা ।


-ওয়ালাইকুম আসসালাম । কোথায় তুমি?


-এই তো হলে।


যদিও মিথ্যা কথা। হলের গেট থেকে বেশ খানিকটা দূরেই দাঁড়িয়ে আছি। আব্বা বললেন,


-তৃষার পায়ে নাকি একটা অপারেশন হয়েছে আজকে?


-জি।


-তুমি কি সাথে ছিলে?


আমি খানিকটা টেনশনে পড়লাম। এখন সত্য বলবো নাকি মিথ্যা বলব ? আমার একবার মনে হল আমি সত্য কথাটা না বলি। আমি তো তার সাথেই ছিলাম। তৃষাকে হলে পৌঁছে দিয়ে এসেছি। তবে এই কথা সত্য যে প্রথম থেকে সাথে ছিলাম না। জানতামই না, থাকবো কিভাবে! আমার তো আর দোষ না।


পরে মনে হল তৃষার যে পায়ে অপারেশন হয়েছে এই কথা তো আমি আব্বাকে বলি নি। তারপরেও সে জেনে গেছে। এর অর্থ হচ্ছে সে অন্য তথ্যগুলোও জানতে পারে। তার কাছে মিথ্যা বলে লাভ নেই। আমি সত্য কথাটাই বললাম। তবে পুরোপুরি বললাম না।


-হ্যা, আমি ওকে হাসপাতাল থেকে হলে নিয়ে গিয়েছি। একেবারে গেটের বিল্ডিংয়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।


কিন্তু আমি মাঝেমধ্যে ভুলে যাই যে আমার বাবা আমাকে জন্ম দিয়েছে। আমি কেমন সেটা সে খুব ভাল করেই জানে। সে পাল্টা প্রশ্ন করলো,


-তৃষাকে নিয়ে গেছিলে হাসপাতালে ?


এই হচ্ছে কথা। সে আসল তথ্য জানে। তারপরেও আমার মুখ দিয়ে শুনতে চায়।


আমি মিনমিন করে বললাম,


-আমি তো জানতামই না। তৃষা তো আমাকে কিছু বলেই নি।


-তোমার বউয়ের খোঁজখবর রাখার দায়িত্ব কার উপর? তাকে কেন সব কথা খুলে বলতে হবে? তুমি ভাত খাও না? ঘাস খাও? তুমি জানো না বাড়ির মেয়েরা কখনই নিজেদের সমস্যার কথা বলতে চায় না। সেগুলো বুঝে নিতে হয়। তোমার আম্মা তো আমাকে তার সমস্যার কথা কোনদিন বলে না, আমি তো ঠিকই বুঝি তার কি সমস্যা ! একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়, থাকো কাছাকাছি, তবুও তুমি জানবে না?


-স্যরি আব্বা।


-আমাকে স্যরি কেন বলছো? আমি কি একা একা হাসপাতালে গিয়েছি? যে গিয়েছে তাকে বল।


-জি আচ্ছা।


-আর শুনো, কাল ভোরে মনজুর যাবে তোমার কাছে। তৃষাকে নিয়ে সোজা বাসায় আসবা।


-জি আচ্ছা।


-এখন ফোন রাখ। আর দ্রুত হলে ফেরত যাও। রাতে বাইরে থাকা ঠিক না।


-জি আচ্ছা।


আমি ফোন রেখে দিলাম। আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আব্বা ঠিকই টের পেয়েছে যে আমি এখনও বাইরে রয়েছি। আমি দ্রুত পা চালাতে শুরু করলাম।


আজকে আমার সাথে কি হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। দুপুরে ক্লাস আর আড্ডা শেষ করে বাইরে বের হতেই দেখি সামনে দিয়ে নীতু এগিয়ে আসছে। আমি নীতুর সাথে সরাসরি আজ পর্যন্ত কথা বলি নি। আমাদের মাঝে কেবল চোখাচোখি হয়েছে অনেকবার। আমি ভেবেছিলাম হয়তো কোন একটা কাজে সে ডিপার্টমেন্টের দিকে যাচ্ছে। অন্যদিনের মত আজকেও আমাদের কেবল চোখাচোখি হবে। তারপর সে চলে যাবে তার পথে, আমি যাবো আমার পথে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে নীতু একেবারে আমার সামনেই দাঁড়িয়ে পড়লো। আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,


-আজকে যাবেন না রিতুকে পড়াতে?


আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম কিছুটা সময়। বললাম,


-হ্যা, যাবো তো।


-চলুন আজকে আমার সাথে। আজকে আম্মু একটু আগে আগে যেতে বলেছে।


আমার মাথার ভেতরে কিছুই ঢুকছিলো না এসব। কি হচ্ছে এসব ? এই মেয়েটার আচরন আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। নীতু কখনই আমার সাথে এতো ফ্রি ছিল না। এক বারে হুট করে এতো কাছাকাছি কেন চলে আসতে চাইছে?


আমার এখন কি করা উচিৎ?


আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না।


নীতুর সাথে রিক্সায় উঠতে আমার কেমন একটা মিশ্র অনুভূতি হল। মনের এক পক্ষ বলছে যে এই মেয়েটা নিজ থেকে তোমার সাথে রিক্সায় উঠেছে, এতে কোন দোষ নেই। তুমি তো খারাপ কিছু করছো না। পৃথিবীর কোন আইনে লেখা আছে যে বিয়ে হলেই অন্য মেয়ের সাথে রিক্সাতে ওঠা যাবে না। এমন কোন আইন নেই। কিন্তু সেই সাথে অন্য আরেকটা অংশ আমাকে ধিক্কার দিতে লাগলো। বারবার বলতে থাকলো যে নীতু অন্য কোন মেয়ে নয়, এই মেয়ের সাথে তোমার আচরণ কোনদিন স্বাভাবিক হবে না। এখন তোমার বউ আছে। এখন নীতুর সাথে তোমার মেলামেশা মানায় না।


আমি কোনদিকে যাবো বুঝতেই পারছিলাম না। নীতু যেন কি জিজ্ঞেস করলো। আমি জবাব দিলাম। আরেকটা প্রশ্ন করলো কিন্তু সেটার উত্তর দেওয়ার আগেই আমার ফোন বেজে উঠলো। ফোনের দিকে তাকিয়েই অবাক হলাম। আমার শ্বশুরমশাই ফোন দিয়েছেন। তিনি আমাকে এই সময়ে ফোন কেন দিলেন? তিনি সাধারণত রাতে ফোন দেন। এখন কেন?


-হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।


জবাব এল ওপাশ থেকে। খানিকটা উৎকন্ঠিত কন্ঠস্বর বুঝতে পারলাম।


বললাম,


-কি হয়েছে?


-তৃষা হাসপাতালে!


কথাটা শোনার পরেই আমার মাথার ভেতর থেকে অন্য সবকিছু হারিয়ে গেল মুহূর্তের ভেতরেই। আমার পাশে যে কেউ বসে আছে এটাও আমার মনে রইলো না। মনে রইলো না আমি কোথাও যাচ্ছিলাম। আমার কেবল হচ্ছিল যে তৃষা হাসপাতালে রয়েছে। কি আশ্চর্যভাবে আমি এই ব্যাকুলতা অনুভব করতে পারছিলাম ! আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।


-কোন হাসপাতালে?


শ্বশুর মশাই নাম বললেন। আমি বললাম,


-আমি যাচ্ছি এখনই।


ফোন রেখে চারপাশে তাকালাম। আমার কেবল মনে হল যে যেকোনভাবে হোক আমাকে এখন ধানমণ্ডি পৌঁছাতে হবে। তৃষা এখন সেখানেই আছে। একা রয়েছে।


নীতুকে বললাম,


-আমাকে একটু ধানমণ্ডি যেতে হবে। ওখানে একজন হাসপাতালে রয়েছে। একা।


আমি রিক্সাওয়ালাকে রিক্সা থামাতে বললাম। তারপর রিক্সাটা ঠিকমত থামার আগেই লাফ দিয়ে নেমে গেলাম। আমাকে এখন ধানমণ্ডি যেতে হবে। তৃষা একলা রয়েছে ওখানে।।


তৃষাকে আবার হলে রেখে এসে আমার মনে একটু শান্তি লাগলো। যখন ওর হলের গেট থেকে বের হলাম আমার নিজের কাছে কেমন যেন একটা লজ্জা অনুভূত হল। আমি কিভাবে ওকে সবার সামনে কোলে নিয়ে ফেললাম কোন কিছু না চিন্তা করেই! আশেপাশের মানুষগুলো কি ভাবছে কে জানে! আচ্ছা ভাবুক। কিছু যায় আসে না। আমি এমন কোন অন্যায় করি নি।


বিকেলবেলা রিতুর ফোন পেয়ে খানিকটা অবাক হয়েছিলাম। নীতুর ভাষ্যমতে আজকে ওরা নাকি বাইরে যাবে। এইজন্য আমাকে একটু আগে আগে যেতে বলেছিল। কিন্তু আমি তো আর যেতে পারলাম না তৃষার হাসপাতালে থাকার কথা শুনে। অথচ রিতু আমাকে জানালো যে ও বাসাতেই আছে। আমি নীতুর কথা বলতে গিয়েও আটকে গেলাম। মেয়েটার আচরণ আজকে কেমন যেন মনে হচ্ছিলো । এমন আচরণ কেন করলো মেয়েটা ?


আমি আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করলাম না । রিতুকে পড়াতে চলে গেলাম ! ওদের বাসার পরিবেশ স্বাভাবিকই মনে হল । তবে ঐদিনের পর থেকে রিতুদের বাসায় আমার যত্ন যেন একটু বেশিই বেড়ে গিয়েছে । বিশেষ করে নাস্তার বেলায় । আগে তো ভাল নাস্তা আসতোই, এখন আরও ভাল নাস্তা আসতে শুরু করেছে । তবে আজকে সবকিছুর চূড়ান্ত হল । আজকে আমার যেতে এমনিতেই একটু দেরি হয়ে গিয়েছিলো । পড়ানো শেষ করে বের হওয়ার আগে রিতুর মা এসে বলে গেল যে আজকে রাতে যেন আমি ওদের বাসায় খেয়ে যাই !


রাতে খেতে গিয়ে দেখা হল রিতুর বাবার সাথে । ভদ্রলোকের বয়স কত আমি ঠিক আন্দাজ করতে পারলাম না । বেশ ইয়াং দেখতে । নীতুকে তার মেয়ে কম ছোট বোন মনে হল । শরীর স্বাস্থ্য একেবারে ফিট ! এবং চোখ মুখে খুবই আত্মবিশ্বাসের ছায়া । নিজক্ষেত্রে বেশ সফল মানুষ সে ! সফল মানুষের আত্মবিশ্বাস থাকে বেশি ।


আমার দিকে হেসে হেসে কথা বলতে শুরু করলেন । আরও ভাল করে বললে আমার ইন্টারভিউ নিতে শুরু করলেন । আমার পড়াশুনা, রেজাল্ট কেমন হচ্ছে । তারপর বাসায় কে কে আছে ! বাবা কি করে, ভাই কি করে এইসব ।


সকল প্রশ্নের জবাবই আমি হাসিমুখে দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম । খাওয়া দাওয়া শেষ হল তবে আমার মনে হল যে ভদ্রলোকের প্রশ্ন শেষ হল না । আরও কিছু জানতে চাইতেন কিন্তু রিতুর মায়ের কারণে পারলেন না । বাকি প্রশ্ন যে সে অন্য কোনদিন করবে সেই বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই ! তবে এটুকু বুঝতে কষ্ট হল না যে আমার ইন্টারভিউ নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন ।


মা, মা আমি পরীক্ষায় পাশ করেছি । এখনই আমার আরেকটা বিয়ে হবে!


কদিন আগে আমার একটা বিয়ে হচ্ছিলো না ! মানে বলতে চাচ্ছিলাম যে একজনকে পটাতে পারছিলাম না । আর আজকে দেখি একটা বিয়ে তো হয়েছেই, আরেকজন বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে । খুব ইচ্ছে হল যে এদেরকে চিৎকার করে বলি যে শুনেন আন্টি, আমি বিয়ে করে ফেলেছি । কি করবো বলেন ! বাবার মান সম্মান বাঁচাতে করেছি । একসময় আপনার মেয়ের পেছনে ঘুরঘুর করতাম বটে কিন্তু দিন দিন আমার নিজের বউ আমার কাছে বেশ ভাল লাগছে । শান্ত-স্নিগ্ধ ঐ মেয়েটার মুখ আমাকে রাতে জাগিয়ে রাখছে ।


রিতুদের বাসা থেকে বের হয়ে এসে খানিকক্ষণ রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে রইলাম । আমার মন বলছে নীতু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে । সম্ভবত দরজার আড়ালে । আমি তাকালেই পালিয়ে যাবে !


আমার এখন ওদিকে তাকানো মোটেই ঠিক হবে না । কিন্তু না তাকিয়ে পারলাম না । আমার ধারণা খানিকটা ভুল প্রমাণিত হল । নীতু দাঁড়িয়েছিল তবে দরজার আড়ালে না । গ্রিল ধরে । অন্যদিনের মত পালিয়ে গেল না । সোজা আমার দিকেই তাকিয়ে রইলো ।


আমার কেন জানি নীতুর জন্য খারাপ লাগতে শুরু করলো । মেয়েটাকে আমি নিজে স্বপ্ন দেখিয়েছি । নয়তো একটা মেয়ে এতোদূর পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে না । আমার নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগলো । আমি হাটতে শুরু করলাম । আজকে কেন জানি রিক্সা নিতে ইচ্ছে হল না । আজকে হেটে হেটেই যাবো হলে !

|

|

চলবে.....??

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url