গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (৯)

 


নিলয়ের কথাঃ


রিতুদের বাসায় আসলে আমার মন দুইটা কারণে ভাল থাকে সবসময় । প্রথম কারণটা হচ্ছে রিতুদের বাসাতে সন্ধ্যার নাস্তাটা সবসময়ই চমৎকার হয় । এমন না যে আমি নিজে খারাপ কিছু খাই । খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমি সবসময়ই একটু বড়লোকী ভাব নিয়ে চলি । বাসা থেকে যেহেতু পর্যাপ্ত টাকাপয়সা আসে আর আমি নিজেও বেশ ভাল টাকাপয়সা আয় করি, তাই খাওয়ার পেছনে টাকা খরচ করতে খুব একটা সমস্যা হয় না । কিন্তু আমি যা খাই তার প্রায় সবটাই বাইরে থেকে কিনে খাই । রিতুদের বাসার বানানো খাবারের মজাই আলাদা ।


আর দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে, রিতুর বড় বোন নীতু । প্রতিদিন বাসায় ঢোকার পর থেকে আমার মনের ভেতরে কেবল একটা ইচ্ছেই ঘোরাঘুরি করতে থাকে - যদি নীতুর একটু দেখা পাই, যদি একটু সময়ের জন্য সে এই ঘরের দরজাতে আসে কিংবা বারান্দায় এসে হাটাহাটি করি । রিতু আর নীতুর ঘরটা আলাদা হলেও বারান্দা একটাই । সুতরাং মাঝে মাঝেই আমি নীতুর দেখা পাই সেখানে ।


তবে আজকে দুটো মন ভাল করার ঘটনা একসাথেই ঘটলো । আজকে নীতু নিজেই নাস্তার ট্রে নিয়ে হাজির হল । আমি খানিকটা অবাক না হয়ে পারলাম না । এমনটা এর আগে কোনদিন হয় নি । বেশির ভাগ সময়েই বুয়া নাস্তার ট্রে নিয়ে আসে । মাঝে মাঝে রিতুর আম্মু নিয়ে আসে কিন্তু নীতু কোনদিন নিয়ে আসে নি । আজকেই ও প্রথম নাস্তার ট্রে নিয়ে এসে হাজির হল । আমি নিজেকে বোঝাতে চাইলাম যে এই মেয়ের দিকে এখন আর আমার তাকানোটা মোটেই উচিৎ হবে না । আমার সাথে অন্য একটা মেয়ের বিয়ে হয়েছে, এখন অন্য একজন মেয়ে আমার বউ । কিন্তু নীতুর দিকে একবার না তাকিয়ে আমি পারলাম না ।


অন্যদিন নীতু এমন একটা ভাব করতো যেন আমাকে সে ঠিক চেনেই না । আমি কেবলই তার ছোট বোনের শিক্ষক, এর বেশি কিছু নয় । মাঝে মাঝে সে ফোন করতো আমাকে ওর মায়ের ফোন দিয়ে । কিন্তু কোনদিন কথা বলে নি । আমি কিছু সময় কেবল হ্যালো হ্যালো করতাম । কিন্তু যখন বুঝতাম যে ওপাশে নীতু রয়েছে তখন আর কোন কথা বলতাম না । দুজন কেবল দুই দিক থেকে চুপ করে একে অন্যের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতাম ।


কিন্তু আজকে নীতুকে অন্যরকম মনে হচ্ছে । নীতু আজকে নীল আর বেগুনীর মিশেলে একটা পোশাক পরে এসেছে । সাথে সাদা রংয়ের লেগিংস আর সাদা ওড়না । ওড়নার কিছুটা অংশ মাথায় দেওয়া । চুলগুলো এক পাশে করে সামনে নিয়ে আসা !


নাস্তার ট্রে-টা টেবিলে রাখতেই রিতু বলে উঠলো,


-স্যার, আজকে সব নাস্তা আপু বানিয়েছে ।


-তাই নাকি ?


আমি আর কি বলবো ঠিক খুঁজে পেলাম না । আরও কিছু কি বলা উচিৎ মেয়েটাকে ? বাড়ির বড় মেয়ে ইচ্ছে করলে নাস্তা বানাতেই পারে । আমার জন্য তো আর বানায় নি, সবার জন্য বানিয়েছে । আমি একটু হাসলাম নীতুর দিকে তাকিয়ে । ধন্যবাদমূলক হাসি । রিতুর দিকে তাকিয়ে মনে হল ও খুব আনন্দে আছে । নীতু চলে যেতেই রিতু বলল,


-স্যার, জানেন আজকে নীতু আপুকে দেখতে আসার কথা ছিল ।


-তাই নাকি ?


-জি স্যার ।


-আসে নি ?


-না । আপু খুব কান্নাকাটি করছিলো ।


নীতু কান্নাকাটি করছিলো । কেন ? সে বিয়ে করতে চায় না ?


মানা যেহেতু করেছে সেহেতু অবশ্যই বিয়ে করতে চায় না । নীতু কেবল সেকেন্ড ইয়ারে ভর্তি হয়েছে । আমার নিজের ডিপার্টমেন্টেই পড়ে সে । এখন সে বিয়ে করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতেই পারে । কিন্তু আমার কেন জানি মনে হল, নীতুর এই বিয়ে করতে না চাওয়ার পেছনে যে কারণটা রয়েছে সেটার সাথে আমি কোন না কোনভাবে জড়িত । দুই সপ্তাহ আগে এটা হলে আমার থেকে বেশি খুশি আর কেউ হত না । কিন্তু এখন আমি উপরওয়ালার কাছে হাত জোর করে চাইলাম যেন এমন কিছু না হয় !


জিজ্ঞেস করবো না করবো না করেও রিতুকে প্রশ্নটা করেই ফেললাম । বললাম,


-কেন, কান্নাকাটি করছিলো কেন ?


রিতু বলল,


-আপুর অন্য একজন ছেলেকে পছন্দ ।


কথাটা বলেই রিতু কেমন মুখ টিপে হাসলো । আমার তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না যে যা আশংঙ্কা করেছিলাম ঘটনা সেদিকেই যাচ্ছে । ব্যাপারটা আরও প্রকট হল যখন আমি পড়ানো শেষ করে বের হত যাবো তখন । রিতুর মা আমাকে ড্রয়িংরুমে বসালেন । খুব হাসি হাসি মুখ করে আমার খোঁজখবর নিতে শুরু করলেন । বিশেষ করে আমার গ্রামের বাড়ি কোথায়, আমার বাবা কি করে, আমরা কয় ভাইবোন ইত্যাদি ইত্যাদি । আমার কাছে মনে হচ্ছিলো তিনি যেন আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন । আমার সাথে তার মেয়ের বিয়ে দেওয়া যায় কি না । আমি খুব নিশ্চিতভাবেই জানি যে এরপর নীতুর বাবা আমার সাথে কথা বলবেন। তারপর ওদের আত্মীয়স্বজনেরা আসবে একে একে । আমাকে হয় সরাসরি দেখবে নয়তো লুকিয়ে ঝুকিয়ে দেখবে । নানান ভাবে আমার সাথে তারা কথা বলবে । নীতুর জামাই হিসাবে আমাকে মানাচ্ছে কিনা সেটা তারা পরখ করে নেবে !


আমি কেবল উপরওয়ালার দিকে তাকিয়ে বললাম,


-এতো কিছুই যখন করবে তখন আর সপ্তাহ দুয়েক আগে করলে না কেন! সেই সময়ে আমার জন্য এটা কতই না আনন্দের ব্যাপার হত ।


নীতুকে আমি সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকেই পছন্দ করি । আমার ফার্স্ট ইয়ার না, ওর । ও প্রথম যেদিন আমার ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হল, সেদিন থেকেই । তারপর একদিন জানতে পারলাম যে আমাদের ক্লাসের রাফিদ নাকি নীতুর ছোট বোনকে পড়াতে যাওয়া শুরু করেছে । আমার কেবল মনে হল যেকোনভাবেই হোক আগে নীতুদের বাসায় আমাকে ঢুকতে হবে । রাফিদকে গিয়ে ধরলাম । সে তো কিছুতেই রাজি হবে না । তারপর একসময় বেতনের অর্ধেকটা দেওয়ার শর্তে রাজি হল । ডিল হল ছয় মাস ওদের বাসা থেকে যে বেতন পাবো সেটার অর্ধেক ওকে দিতে হবে । তাহলে ওর স্থানে সে আমাকে ঠিক করে দেবে ।


আমি তখন তাতেই রাজি হয়ে গেলাম । আমার মাথার ভেতরে তখন কেবল নীতুই খেলা করছিলো । অন্য কিছু আমি ভাবছিলাম না । তবে রাফিদ আমাকে কোন নিশ্চয়তা দিল না । এমন একটা সম্ভাবনা রয়েছে যে আমাকে ওদের পছন্দ হল না । তখন রাফিদের কিছুই করার থাকবে না ।


তবে ভাগ্য ভাল যে ওরা রাজি হয়ে গেল । আমি ধীরে ধীরে রিতুকে পড়াতে শুরু করলাম । প্রথম প্রথম নীতুর দেখা পেতাম না একদমই । আমার মনে হত যে যখন আমি পড়াতে যেতাম নীতু তখন ইচ্ছে করেই ঘর থেকে বাইরে বের হত না । এমনকি ওর গলার একটু আওয়াজ পর্যন্ত আমি শুনতে পেতাম না । অথচ দেওয়ালের ওপাশেই নীতুর ঘর ছিল । প্রথম মাসে একবারও দেখা হল না নীতুর সাথে । কিন্তু এদিক দিয়ে বেতনের অর্ধেকটা রাফিদকে দিয়ে দিতে হল । অবশ্য তাতে খুব একটা কষ্ট হল না । টাকাপয়সা কখনই আমার খুব একটা দরকার ছিল না ।


টিউশনী থেকে বের হয়ে আমি খানিক সময় এদিক ওদিক হাটাহাটি করলাম । কিছুই যেন আমার ভাল লাগছিলো না । কি করবো না করবো কিছুই মাথায় ঢুকছিলো না । একবার মনে হল ভাইয়ার বাসায় গিয়ে হাজির হই । ভাইয়াকে বাবা বাড়ির ধারে কাছে যেতে মানা করেছে। আমার সামনেই বাবা ভাইয়াকে ফোন করে বলেছে যে ভাইয়া যেন আর কখনই গ্রামে আসার চেষ্টা না করে । বাবা-ছেলের সম্পর্ক আর তাদের মাঝে নেই । আমাকে সহ বাড়ির সবাইকে পরিস্কার কন্ঠে বলে দিয়েছে, ভাইয়ার সাথে যে সম্পর্ক রাখবে তার সাথে বাবা কোন সম্পর্ক রাখবে না ।


গতদিন ভাইয়ার বাসায় গিয়ে হাজির হয়েছিলাম । তাদের দুজনের অফিসই গুলশানে । ওখানেই তারা বাসা নিয়েছে । ছিমছাম তিন রুমের একটা বাসা । সূচি ভাবীর সাথে কথা বলে বেশ ভালই মনে হল তাকে । আমি নিশ্চিত, ভাইয়া যে এতো সাহস করে এই কাজটা করতে পেরেছে এর পেছনে সূচি ভাবীর হাত রয়েছে শতভাগ । যে মেজাজ গরম নিয়ে ভাইয়ার বাসায় গিয়ে হাজির হয়েছিলাম সেটা কেন জানি আর ধরে রাখতে পারি নি । বাবা যে কাজটা করেছে সেটা মোটেই ঠিক করে নি । জীবনের সব কাজে সে নিজের সিদ্ধান্ত ভাইয়ার উপর চাপিয়ে দিয়ে এসেছে । এই অধিকারটা তার কোনভাবেই নেই । বাবা হওয়া সত্ত্বেও নেই । অন্তত বিয়ে দেওয়ার আগে ভাইয়ার কাছে তার মনোভাব জানতে চাওয়াটা বাবার উচিৎ ছিল । আমার কাছে যেমন করে বাবা জানতে চেয়েছিলো, তেমন করেই জানতে চাওয়া উচিৎ ছিল । আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছি । কিন্তু নীতুর সাথে যদি আমার কোন সম্পর্ক থাকতো, ওকে যদি কথা দিতাম তাহলে আমি কোনভাবেই রাজি হতাম না সেই বিয়েতে । কিছু হয় নি বলেই সম্ভবত বাবার কথা আমি ফেলতে পারি নি ।


ভাইয়া আর ভাবীকে দেখলাম বেশ অপরাধী মুখ করেই আমার সাথে কথা বলতে । হাজার হলেও তাদের কারণেই আমার জীবনের সাথে এমন কিছু হয়ে গেল । রাতে খাওয়ার সময় ভাইয়া বলল,


-একদিন তোর বউকে নিয়ে আয় এখানে !


ভাবীও সায় দিল কথায় । বলল,


-হ্যা, নিয়ে আসো একদিন । আসলে বিয়েটা কপালে লেখা থাকে । মেয়েটার সাথে তোমার ভাগ্য জড়িয়ে ছিল । কি করবে বল !


আমি বললাম,


-দেখা যাক ! আগে আমার সাথে দেখা হোক ভালভাবে । তারপর নিয়ে আসবো একদিন ।


তৃষার সাথে আমার দেখা হল পরেরদিনই । আমি ওকে দেখতে পাই নি । ক্যাম্পাসে সেশন ফি দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আরিফের সাথে । বেশ লম্বা লাইন । হঠাৎ কেউ পাশে এসে দাঁড়ালো । তাকিয়ে দেখি তৃষা । আমার দিকে খানিকটা ইতঃস্তত ভাব নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমি ওকে দেখতেই একটু হাসার চেষ্টা করলাম । তৃষা বলল,


-অনেক লম্বা লাইন তো ।


আমি বললাম,


-হ্যা । অনেক লম্বা লাইন ।


-আমাকে ফরমটা দাও । আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি । মেয়েদের লাইনটা ছোট আছে ।


আমি আরিফের সামনে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম । আরিফ জিজ্ঞাসু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে । একবার মনে হল তৃষাকে বলি যে দরকার নেই আমি দিয়ে দিবো । কিন্তু বলতে পারলাম না । মেয়েটা যখন আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এসেছে তখন না করাটা ঠিক হবে না ।


আমি নিজের ফরম আর টাকাটা ওর কাছে দিয়ে দিলাম । ও সেটা নিয়ে মেয়েদের লাইনের দিকে চলে গেল । তৃষা যেতেই আরিফ আমার দিকে তাকিয়ে বলল,


-এটা কে রে ?


এখন আমার কি বলা উচিৎ ?


বলা উচিৎ যে এই মেয়েটা আসলে আমার বউ । কদিন আগে মেয়েটার সাথে আমার ভাইয়ার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল কিন্তু কপালের দোষে আমার সাথে হয়েছে । কিন্তু বলতে পারলাম না । বললাম,


-পরিচিত । বাবার বন্ধুর মেয়ে ।


আরিফ খানিকটা সময় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো যে আমি সত্যি বলছি কি না । কি বুঝলো কে জানে তবে আর কিছু জানতে চাইলো না ।


অল্প কিছু সময়ের ভেতরেই তৃষা ফি জমা দিয়ে চলে এল । আমার মনে হল ওকে একটা ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ । অন্তত এক কাপ চা খাওয়ার অফার তো করাই যায় । আমি বললাম,


-তুমি চা খাবে ?


তৃষা খানিকটা ইতস্তত করে বলল,


-চা ?


-হ্যা । এই যে রঘু মামার চা-টা বেশ ভাল ।


এই বলে আমি হাত দিয়ে ইশারা করে দেখালাম । তৃষা আবারও খানিকটা সময় ইতঃস্তত করে তাকিয়ে রইলো সেদিকে । তারপর বলল,


-চল, যাওয়া যাক ।


সেই সময়টাতে আমার কেমন মনে হওয়া উচিৎ আমি নিজেই বলতে পারবো না । তবে মনের ভেতরে একটা অস্বস্তি ঠিকই কাজ করছিলো । যতই সে আমার বউ হোক, আমাদের ভেতরের সম্পর্কটা কোন স্বাভাবিক ঘটনার ভেতর দিয়ে শুরু হয় নি । সেই সম্পর্ক সম্ভবত কোনদিন স্বাভাবিক হবেও না ।

|

|

চলবে.....??

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url