গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (৮)
তৃষার কথাঃ
প্রতিটি মেয়ের জীবনে এই বাসর রাত নিয়ে কত স্বপ্ন থাকে । যখন থেকে সে বুঝতে শেখে তখন থেকেই মনের ভেতরে একটা স্বপ্ন আস্তে আস্তে দানা বাঁধতে শুরু করে এই বাসর রাতকে কেন্দ্র করে । আমার মনেও এমন একটা স্বপ্ন ধীরে ধীরে ডালপালা মেলছিলো । আমিও স্বপ্ন দেখতাম এক রাজপুত্রের সাথে আমার বিয়ে হবে । আমরা বাসর রাতে একটুও ঘুমাবো না। দুজন মিলে সারাটা রাত গল্প করবো । আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সব গল্প আমি তার সাথে করবো । তাকে বলবো কিভাবে একবার আমি ছাদের সিঁড়ি থেকে প্রায় নিচেই পড়ে যাচ্ছিলাম। তারপর কিভাবে আমি একা একাই সেখান থেকে বেঁচে যাই । সেদিন যদি নিচে পড়ে যেতাম তাহলে হাড়গোড় সব ভেঙ্গে একাকার হয়ে যেত । এর থেকেও বেশি ভয় ছিল আমার মায়ের মারের । মা যদি জানতো যে আমি পড়ে গিয়েছিলাম তাহলে আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিত ।
এই কথাগুলো শুনে সে তখন খুব হাসতো । তার জীবনেও নিশ্চয়ই এমন কোন ঘটনা থাকতো যা শুনে আমি খুব হাসতাম । তার কাছে জানতে চাইতাম যে জীবনে কতগুলো প্রেম করেছে সে । এখনও কেউ আছে কি না । তারপর তার প্রেমিকার কথা শুনে কপট অভিমান করতাম । সে তখন নিশ্চয়ই বলতো, এই কানে ধরছি জীবনে তুমি ছাড়া আর কোন মেয়ের দিকে আমি তাকাবোই না আর ।
এই রকম কত কথাই না আমি ভেবে রেখেছিলাম মনে মনে । কিন্তু সব থেমে গেল ঐদিনের পরেই । তারপর মনের ভেতরে এক প্রকার ঠিকই করে নিয়েছিলাম যে আমার কপালে আর স্বাভাবিকভাবে বিয়ে হবে না । হয়তো কোনদিন বিয়েই হবে না । আমার না বলা কথাগুলা হয়তো সবসময় নিজের কাছেই রয়ে যাবে । তাই মাঝে মাঝেই এই কথাগুলো আমি নিজের ডায়রিতে লিখে রাখতাম । এটা ছাড়া আর কিছু করার নেই ।
আজকে আমার বিয়ে হয়ে গেছে । ঠিক যেমনটা ভেবেছিলাম তেমনটাই হয়েছে। কোন স্বাভাবিক বিয়ে হয় নি । বর গাড়ি থেকেই পালিয়েছে । তার ছোট ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে । নিজের কাছে যে কেমন লাগছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না । গাড়িতে যখন কান্না আসলো, অনেকটা সময় নিয়েই আমি কাঁদলাম । নিলয়, মানে আমার সদ্য বিবাহিত স্বামী আমার পাশে বসেছিল । একটা টিস্যুর বক্স সে আমার দিকে এগিয়ে দিল । আর কোন কথা বলল না ।
ওদের বাসায় পৌঁঁছাতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেল । আমি ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছি । মেনে নিয়েছি যে এটাই আমার ভাগ্য । আমার কপালে আর কিছু নেই আসলে । আমি ভেবেছিলাম নিলয়দের বাসায় হয়তো আমাকে খুব ভালভাবে স্বাগত জানানো হবে না। কিন্তু অনেকটা অবাক হয়েই দেখলাম যে সবাই আমার আসার জন্যই অপেক্ষা করছিলো । বাসায় ঢুকতেই ব্যান্ড পার্টি বেজে উঠলো ।
আমি আজও বুঝতে পারলাম না বিয়েতে এই বিকট সুরগুলো কেনা বাজানো হয় । এমনকি যখন আমাদের বাসায় এই ব্যান্ড পার্টির বাজনা বাজছিলো, আমার খুব বিরক্ত লাগছিলো । কিন্তু এই বাসায় যখন বাজনা বেজে উঠলো আমার কেন জানি সুরটা ভালই লাগলো । কেন এমনটা মনে হচ্ছিলো আমি বলতে পারবো না । সত্যিই বলতে পারবো না ।
নিলয়ের মা অর্থ্যাৎ আমার শাশুড়ি আমাকে খুব আন্তরিকভাবেই বরণ করে নিলেন । সবার সাথে হাসিমুখে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন । সব ঝামেলা শেষ করে আমি যখন বাসর ঘরে ঢুকলাম তখন প্রায় রাত বারোটা । ক্লান্তিতে আমার শরীর ভেঙ্গে যাচ্ছিলো । কেবল মনে হচ্ছিলো যে এখন আমার ঘুম দরকার । আর কিছু না ।
বিছানায় বসে অপেক্ষা করতে করতে সত্যিই কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি নিজেও বলতে পারবো না। সেই ঘুম ভাঙ্গলো আমার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে । চোখ মেলে কিছু সময় এদিক ওদিক দেখতে লাগলাম কেবল । প্রথমে মনে হল যে আমি হয়তো স্বপ্ন দেখছি । কিন্তু স্বপ্ন দেখছি না । আমি বিছানার এক পাশে ঘুমিয়েছিলাম । ওপাশটা তখনও খালি এবং বিছানার ঐ অংশটার চাদরে কোন ভাজ পরে নি । অর্থ্যাৎ সেখানে কেউ ঘুমায় নি রাতেরবেলা ।
নিলয় এসেছিলো কি রাতে এই ঘরে ?
আসবেই । না এসে যাবে কোথায় ?
তাহলে কোথায় ছিল সে ?
আমি ঘরের চারিদিকে তাকাতে লাগলাম । এটা সম্ভবত নিলয়ের বড় ভাইয়ের ঘর । যখন এই ঘরে বাসরটা সাজানো হয়েছিলো তখন তো আর কেউ জানতো না যে ঘটনা এমন হবে । আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পুরো ঘরটা দেখতে লাগলাম । রাতে ক্লান্তির কারনে আমি কিছুই লক্ষ্য করি নি। এখন কেন জানি লক্ষ্য করতে শুরু করলাম ।
এই ঘরে খুব বেশি জিনিসপত্র নেই । একটা খাট, একটা কম্পিউটার টেবিল আর একটা ওয়্যারড্রোব রয়েছে । খাটের ঠিক উল্টোদিকে একটা রকিং চেয়ার রাখা । সেটার সামনে দিয়ে বারান্দায় যাওয়ার দরজা । সম্ভবত ইচ্ছে হলেই চেয়ারটা বারান্দায় নিয়ে যাওয়া হয় । আমি টেবিলের কাছে যেতেই খানিকটা অবাক হলাম । কারন তখনই বুঝতে পারলাম যে এই ঘরটা আসলে নিলয়েরই । তার বড় ভাইয়ের নয় । টেবিলে রাখা বইগুলোর দিকে তাকিয়েই আমি বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা । ফয়সাল ইঞ্জিনিয়ার ছিল অথচ এইখানে আমি আই আরের বই দেখতে পাচ্ছি । নিলয় এই বিষয়েই অনার্স করছে । আমার থেকে ঐ অংশটার চাদরে কোন ভাজ পরে নি । অর্থ্যাৎ সেখানে কেউ ঘুমায় নি রাতেরবেলা ।
আমার হঠাৎ কেন জানি মনে হল এই বাড়িতে থাকাটা অতোটা অস্বস্থিকর হবে না যতটা আমি ভেবেছিলাম ।
এই সময়ে পেছনে আওয়াজ হল । আমি পেছনে ফিরে তাকালাম । নিলয়ের সাথে এই প্রথম আমার চোখাচোখি হল । ওর চোখের দিকে তাকিয়েই মনে হল রাতে ওর ঠিকমত ঘুম হয় নি । সে তো রাতে বিছানায় ঘুমায় নি । কোথায় ছিল ?
কেন জানি এই প্রশ্নটার উত্তর জানতে মন চাইলো ।
এমনটা কেন হল আমি নিজেই জানি না । এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল ?
হঠাৎ নিলয় আমার থেকে চোখ সরিয়ে নিল । তারপর বিছানার দিকে হেটে গিয়ে সেখানে বসলো । অন্য দিকে তাকিয়ে বলল,
-রাতে তুমি ঘুমিয়েছিলে দেখে আর ডাকি নি ।
নিলয়ের কন্ঠে খানিকটা কৈফিয়ত দেওয়ার সুর । যেন সে আমাকে না ডেকে খানিকটা অপরাধ করে ফেলেছে । অবশ্য বাসর রাতে বউ বেঘোরে ঘুমাচ্ছে এবং বর বাসর ঘরে ঢুকেও তাকে ডাকে নি - এটা একটা অস্বাভাবিক ঘটনা । আমি বললাম,
-না, ঠিক আছে । সমস্যা নেই । সবাই কি উঠে গেছে ?
-বাবা অনেক সকালে ওঠেন । তিনি মসজিদে নামাজ পড়েন । মাও তার একটু পরেই উঠে পড়ে । সব থেকে দেরি করে ঘুম থেকে উঠি আমি ।
-আর আমি তার থেকেও দেরি করেছি !
নিলয় আমার কথা শুনে হাসলো । তারপর বলল,
-কোন সমস্যা নেই । বাড়ির বউয়ের জন্য সব কিছুতে ছাড় আছে ।
বাড়ির বউ !
শব্দটা শুনতেই কেমন যেন লাগলো । নিলয় উঠে দাঁড়ালো । তারপর বলল,
-তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো । আটটার দিকে নাস্তা দেওয়া হবে টেবিলে ।
নিলয় কথাটা বলে বের হয়ে যাচ্ছিলো আমি ওকে ডাক দিলাম । বললাম,
-নিলয় !
-হুম ।
-আমি জানি না সামনে আমাদের সম্পর্কটা কেমন হবে । সত্যিই জানি না । আমি যেমন তোমাকে এখানে আশা করি নি, আমি জানি তুমিও কর নি । তুমি দয়া করে আমার কাছে কিছু আশা কর না । আমিও করবো না।
নিলয় আমার চোখের দিকে বেশ কিছুটা সময় তাকিয়ে রইলো । তারপর একটু হাসলো । বলল,
-আমি জানি । আটটার দিকে ডাইনিং রুমে চলে এসো ! কেমন !!
নিলয় বের হয়ে গেল । আমি কিছু সময় বিছানার উপর বসে রইলাম । কেন জানি আবারও আমার কান্না আসতে লাগলো । গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করলো আমার ।
পরের সাতটা দিন কোনদিক দিয়ে চলে গেল আমি টেরই পেলাম না । আমাদের বউভাতের অনুষ্ঠানটা খুব বেশি বড় করে করা হয় নি । অল্প কিছু মানুষকে নিয়ে আয়োজনটা করা হয়েছিলো । ঠিক হল যে আমাদের দুজনের পড়াশুনা শেষ হলে ভাল করে অনুষ্ঠান করে আয়োজন করা হবে ।
চারদিন পরে আমি আমার বাসায় ফিরে এলাম । নিলয় আমার সাথে আসলেও সে পরের দিন ফিরে গেল। তার ক্লাস কামাই যাচ্ছে । আমার নিজের ক্লাসও কামাই যাচ্ছে । এখানে আর বেশি সময় থাকার উপায় নেই ।
পরদিন বিকেলবেলা সিমু এসে হাজির । আমার দিকে মুখ টিপে হেসে বলল,
-বর পছন্দ হয়েছে তো ? শুনলাম ছোটজন দেখতে নাকি আরও বেশি কিউট !
আমি কি বলবো খুঁঁজে পেলাম না । আগেরজনকে আমি সামনাসামনি দেখি নি । তবে ফেসবুকে তার কয়েকটা ছবি দেখেছিলাম । তার শরীরের রং বেশি ফরসা । তবে চেহারা বেশ । অন্যদিকে নিলয়ের গায়ের রঙ ওর বড় ভাইয়ের মত অতো ফর্সা না । তবে ওর চেহারার ভেতরে একটা পুরুষালি ভাব আছে । কিউটনেস যে নেই সেটা আমি বলবো না । আরেকবার ব্যাপার হচ্ছে নিলয় ওর বড় ভাইয়ের থেকে একটু লম্বা । বসার ঘরের কোনার দিকে আমি দুই ভাইয়ের একসাথে তোলা একটা ছবি দেখেছিলাম । সেখানে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিলো যে নিলয় বেশি লম্বা !
আচ্ছা, আমি এইসব চিন্তা কেন করছি ?
এই সব কি আমার চিন্তা করার কথা ? সেদিন নিলয়কে আমি কি বললাম ? ওকে বললাম যে আমার কাছে কোন আশা না রাখতে । আবার আমি এখন নিজেই ওকে ওর ভাইয়ের সাথে তুলনা করছি । নিজেকেই যেন বোঝানোর চেষ্টা করছি যে ওর ভাইয়ের থেকে ও বেশি ভাল। আমার জন্য এটাই ভাল হয়েছে ।
আসলেই কি ভাল হয়েছে ?
তবে ঢাকায় ফেরার দিন আমাকে সত্যিই অবাক হতে হল । আমি যখন সকালবেলা বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম যে বাস কয়টায়, বাবা বলল,
-বাসের টিকেট কেন কাটবো ?
-মানে কি ? তোমাকে না বললাম আজকে আমি ঢাকা যাবো । আমার ক্লাস কামাই যাচ্ছে ।
বাবা হাসলো । তারপর বলল,
-আরে যাবি তো । আমি কি মানা করেছি ?
-তাহলে বাসের টিকিট কেন কাটো নি ? আজিব !
-আরে বাবা টিকিট কাটা লাগবে না । তোর শ্বশুর ফোন দিয়েছিলো । নিলয় আসছে গাড়ি নিয়ে । গাড়িতে করে তোরা এক সাথে ঢাকা যাবি !
আমি কি বলবো খুঁজে পেলাম না । বাবার হাসিমুখ দেখে আমার কেন জানি ভাল লাগলো ! সে এখন আর আমাকে নিয়ে খুব একটা চিন্তা করছে না । আমাকে নিয়ে বাবার সবচেয়ে বড় চিন্তাটা ছিল যে তার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে, আমাকে কে দেখে রাখবে ?
এমন কি আগে যখন আমি ঢাকাতে যেতাম বাবার মুখ কালো হয়ে থাকতো । বেশিরভাগ সময়েই সে নিজে গিয়ে আমাকে দিয়ে আসতো । আমি যতই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম যে ঢাকা থেকে এইটুকু পথ আমি একাই যেতে পারবো, কোন সমস্যা হবে না কিন্তু সে শুনতো না । তার কথা হচ্ছে পথেঘাটে বিপদের কোন ঠিক নেই । যদি এমন কিছু হয়ে যায় তাহলে কি হবে ? তখন কে আমাকে রক্ষা করবে !
এখন তার মনে এই চিন্তাটা নেই । তার মেয়েকে দেখে রাখার জন্য তার মেয়েজামাই রয়েছে । সব বাবারাই কি এমন হয় ?
দুপুরের দিকে নিলয় ওদের গাড়ি নিয়ে হাজির হল । দুপুরে খেয়েই আমরা রওয়ানা দিলাম। মিথ্যা বলবো না, আমার কেন জানি একটা আনন্দ অনুভূতি হচ্ছিলো মনে মনে । কেন হচ্ছিলো সেটা আমি জানি না ।
|
|
চলবে....??
