গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (১০)
নিলয়ের কথাঃ
তৃষার চা খাওয়ার ধরণটা আমার কাছে বেশ চমৎকার লাগলো । চাপের কাপটা সে ঠোঁটের কাছে নিয়ে কিছু সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে যাচ্ছে । এরপর একটু ফু দিয়ে চা ঠান্ডা করে নিচ্ছে । তারপর ছোট্ট একটা চুমুক দিয়েই চায়ের কাপটা নামিয়ে আনছে । এটা দেখে আমি কিছু সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম কেবল । আমার মনে তখন কেবল এই কথাটাই এল যে সামনে বসে থাকা এই মেয়েটা আমার বউ । কি অদ্ভুত একটা ব্যাপার ! এই মেয়েটাকে আমি ঠিকমত চিনিও না ।
ঠিকমত কেন বলছি, এই মেয়েটাকে আমি মোটেই চিনি না ! কেবল অল্প কিছু তথ্য জানি ওর সম্পর্কে । আমি কথা হারিয়ে ফেললাম । ওকে কি বলবো সেটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না মোটেই। দেখলাম তৃষা আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে । আর মাঝে মাঝে একইভাবে চায়ে চুমুক দিচ্ছে ।
আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হল না । তৃষা নিজেই জানতে চাইলো,
-তোমার টিউশনী কখন ?
-এইতো বিকেলে ?
-কেমন লাগে ? অভিভাবক ভাল ?
-হ্যা বেশ ! আমি শুনেছিলাম যে তুমিও টিউশনি কর ।
-হ্যা, একটা ছাত্রী আছে । এইবার এইটে উঠেছে । খুব দুষ্ট । কিছুতেই পড়তে চায় না । এই বয়সেই দুইটা বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে ফেলেছে । আমি তো ভাবতেই পারি না ।
এই লাইনটা বলেই তৃষা একটু যেন চুপ করে গেল । একটু হিসাব করে নিচ্ছে যে আসলে আমাকে এই কথাটা এতো সহজে বলা ঠিক হল কি না ! তার ছাত্রীর কয়টা প্রেম হল কি হল না এটা হয়তো বলা ঠিক হচ্ছে না । কম বয়সী ছাত্র-ছাত্রীরা যদি তাদের শিক্ষকদের সাথে ফ্রেন্ডলি হয়ে ওঠে তাহলে তাদের সাথে অনেক কিছুই শেয়ার করে । তার ভেতরে এই ব্যাপারটাও থাকা স্বাভাবিক । আর তৃষা যেহেতু ছাত্রী পড়ায় তাই তৃষাকে মেয়েটা সহজেই বলতে পারে । রিতুও মাঝে মাঝে আমার সাথে এই ধরণের গল্প করে । স্কুলে তার পেছনে কতজন ঘুরছে, কে কি মেসেজ পাঠাচ্ছে, এইসব । আমার মাঝে মাঝে এইসব শুনতে খারাপ লাগে না অবশ্য । আমি তৃষাকে অস্বস্তি থেকে বের করতেই বললাম,
-আমারটাও মাঝে মাঝে এই গল্প করে । ওদের ক্লাসের নাকি কয়েকজন ওর পেছনে ঘুরঘুর করে । কিন্তু ও নিজের মাকে খুব ভয় পায় ।
আমি আসলে তৃষাকে খানিকটা সহজ করতে চেয়েছিলাম । অথচ একটা সময় উপলব্ধি করলাম যে আমার নিজেরই কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে ।
বারবার কেবল মনে হচ্ছে যে যদি কেউ এখানে আমাদের দেখে ফেলে তাহলে কি ভাববে ?
আশ্চর্য হলাম খানিকটা ।
এমন না যে আমি কোনদিন কোন মেয়ের সাথে বসে চা খাই নি । আমার বেশ কয়েকজন মেয়ে বন্ধু আছে । ওদের সাথে মাঝে মাঝেই আড্ডা দিতে এখানে ওখানে চা কফি খাওয়া হয় । রাস্তার পাশের টংয়ের দোকান থেকে শুরু করে এসিঘেরা সব রেস্টুরেন্টেই যাওয়া হয়েছে । তখন তো অস্বস্তি লাগে নি । আর এখানে আমি কেবল একাই নই যে এমন করে কোন মেয়ের সাথে চা খাচ্ছে । চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম যে অন্তত আরও ১২/১৩টা কাপল বসে আছে আমার আশেপাশে । সবাই নিজেদের মধ্যে গল্প করতে ব্যস্ত । তাহলে আমার নিজের কাছে এমন অস্বস্তি কেন লাগছে ? আমার কাছে মনে হল কেউ যেন আমাকে দেখছে । সম্ভবত এই অনুভূতিটাই আমাকে খানিকটা অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে ।
আমার মনের অবস্থা যেন তৃষা বুঝতে পারলো । আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-তুমি ঠিক আছো ?
আমি একটু বোকার মত হাসার চেষ্টা করলাম । কেন করলাম সেটা আমি নিজেই জানি না । বললাম,
-হ্যা, হ্যা ঠিক আছি ।
-আচ্ছা শোনো । আমার একটু হলে যাওয়া দরকার ।
এই কথা বলেই তৃষা উঠে দাঁড়ালো । আমিও উঠে দাঁড়ালাম সাথে সাথেই । বললাম,
-চল আমি এগিয়ে দিয়ে আসি ।
-না দরকার নেই ।
আমি বললাম,
-সমস্যা নেই । আমিও ঐদিকে যাবো । আমার একটু কাজ আছে ঐদিকে ।
যদিও মিথ্যা কথা । আমার কোন কাজ নেই । আমার ক্লাসও নেই । আমি হলে গিয়ে এখন ঘুমাবো । আর আমার হলটা তৃষার হলের বিপরীত দিকে । তৃষা আর কোন কথা বলল না । আমি ওর পাশে পাশে হাটতে লাগলাম ।
ওর গেটের কাছে যাওয়ার পরে ওকে বললাম,
-একটা কথা ছিল ।
-বল?
-ভাইয়া তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছিলো ।
কথাটা শুনতেই তৃষা কেমন যেন একটু চুপ করে গেল ।
আমি বললাম,
-আমার মনে হয় একটাবারের জন্য ভাইয়া আর ভাবীর সাথে দেখা করে আসি আমরা দুইজন । আসলে.....
কিছু বলতে গিয়ে আটকে গেলাম । কি বলবো সেটাই বুঝতে পারলাম না । মনে হল তৃষা হয়তো এখনই কঠিন স্বরে বলবে যে সে ভাইয়ার ওখানে যাবে না মোটেই । তবে আমাকে খানিকটা অবাক করে দিয়ে তৃষা বলল,
-আচ্ছা, একদিন যাওয়া যাবে । আমার শুক্রবারে কোন কাজ থাকে না । ঐদিন দুপুরে যাওয়া যাবে ।
আমি হাসলাম । তৃষাও খানিকটা হেসে হলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো ।
পরের শুক্রবার তৃষাকে নিয়ে হাজির হলাম ভাইয়ার বাসায় । তৃষা একটু সাজগোজ করেই এসেছে । সত্যি বলতে ওকে দেখে আমি খানিকটা মুগ্ধ হয়েই তাকিয়ে ছিলাম । ইদানিং আমার ভেতরের এই ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগে । আবার ভালও লাগে । তৃষা যে আমার বিয়ে করা বউ, এই ভাবনাটা আমার মনের ভেতরে আসতেই কেমন যেন একটা সুক্ষ্ণ আনন্দ অনুভব করি । কেন করি সেটা আমার জানা নেই তবে আনন্দ অনুভূত হয় । বিশেষ করে যখন তৃষাকে দেখি চোখের সামনে ।
আমি জানি তৃষা ভাইয়ার বাসায় আসতে অস্বস্তিবোধ করবে । এই অনুভূতিটা আসা স্বাভাবিক। এটা সবার জন্যই একটা অস্বস্তিকর অবস্থা । তবে আমার কেন জানি মনে হয় যে দুরে থাকলেই বরং এই অস্বস্তিটা আরও বাড়বে । কোনদিন সমাধান হবে না । আমার মনে হয়েছে যদি সামনাসামনি এই ব্যাপারটা নিয়ে কথা হয় তাহলে সব অস্বস্তি দূর হবে যাবে । যা হয়ে গেছে তা আমরা কোনদিন বদলাতে পারবো না । কিন্তু সামনের দিনগুলো যেন ভাল হয় সেই ব্যাপারটা নিয়ে কাজ করতে পারবো । এটার জন্যই আমার নিজেরই খানিকটা আগ্রহ ছিল তৃষাকে এখানে নিয়ে আসার । এখন পুরো ব্যাপারটা তৃষা কিভাবে নিবে সেটাই দেখার ব্যাপার ।
তৃষার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারছিলাম যে ও খানিকটা অস্বস্তিবোধ করছে । ভাইয়ার বাড়ির গেটের কাছে এসে হঠাৎ আমি তৃষাকে বললাম,
- তুমি যদি না চাও তাহলে যেতে হবে না । কোন জোর জবরদস্তি নেই ।
আমার কথাটা শুনে কিছুটা সময় তৃষা আমার দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর বলল,
-না থাকুক । আসলে ....
-আসলে ?
-না কিছু না । চল ভেতরে ঢোকা যাক ।
সূচি ভাবি দরজা খুলে দিলো । আমাকে দেখেই একটা হাসি দিল । তারপর তৃষাকে দেখে সে আনন্দে জড়িয়েই ধরলো । জড়িয়ে ধরাতে একটা কাজ হল । তৃষার ভেতরকার জড়তা বেশ কেটে গেল । তৃষাকে সে নিজের সাথে কিচেনে নিয়ে গেল । তারপর তার সাথে কথা বলতে শুরু করলো । ভাইয়াও বের হয়ে এসেছে । সে আমার সাথে খানিকটা গল্প করলো । বাড়ির কি অবস্থা সেটা জানতে চাইলো । আব্বার রাগ এখনও আছে কি না সেটাও জানতে চাইলো ।
আমি বললাম,
-আব্বা তোমার উপর কি পরিমাণ রেগে আছে সেটা যদি তুমি জানতে ! আপাতত বছরখানেক তুমি খবরদাম গ্রামে যাওয়ার কথা ভাববেও না ।
-সত্যিই নাকি রে !
-একদম সত্যি । আব্বা যদি জানতে পারে যে আমি এখানে এসেছি, তাহলে আমার অবস্থাও খারাপ করে দিবে ।
আমি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম এমন সময় আমার ফোন বেজে উঠলো । ফোনের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম । রিতুদের বাসা থেকে ফোন এসেছে । এখন রিতুদের বাসা থেকে ফোন আসার কথা না । আমি ওদের বাসায় আবার রবিবারে যাব । আজকে তো কোনভাবেই ফোন দেওয়ার কথা না । আমি খানিকটা ইতস্তত করতে করতেই ফোনটা কেটে গেল । তবে আমার মনের ভেতরে অস্তিটা রয়েই গেল । বারবার মনে হচ্ছিলো যে ফোনটা নীতু দিয়েছে ।
এমন সময় দেখলাম সূচি ভাবি বের হয়ে এল । ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
-এই, টক দই শেষ হয়ে গেছে । নিয়ে আসো তো একটু ।
ভাইয়া উঠতেই যাচ্ছিলো আমি বললাম,
-আমি যাচ্ছি ।
-আরে তোমাকে যেতে হবে না । তোমার ভাইয়াই যাক ।
-না, না ভাবি । আমার একটু মোবাইল রিচার্জ করতে হবে । যাবো আর আসবো ।
আমি ঘর থেকে বের হয়ে এলাম । বাড়ির গেট দিয়ে বের হতে না হতেই আবার ফোন বেজে উঠলো । আবারও রিতুদের বাসা থেকে ফোন । আমি ধরবো না ধরবো না করেও ফোনটা ধরলাম ।
হ্যালো বললাম না ।
ওপাশ থেকেও কেউ হ্যালো বলল না । রিতুর মা ফোন করলে আগেই হ্যালো বলতো কিংবা কথা বলতো । রিতুও কথা বলতো । আমার আর আসলে বুঝতে বাকি রইলো না যে ফোনটা কে দিয়েছে । আমার খুব ইচ্ছে হল নীতুকে বলি যে তুমি আর আমাকে ফোন দিও না । একটা সময়ে আমি তোমার সাথে কথা বলার জন্য ছটফট করতাম সত্য কিন্তু এখন আর সেই সময়টা নেই । আমি এখন অন্য একটা মেয়ের সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ।
তৃষার বাবার চেহারাটা আমার চোখের সামনে হঠাৎ ফুটে উঠলো । বিয়ের দিন যখন আমি গাড়িতে উঠছিলাম, তৃষার বাবা হঠাৎ করেই আমার হাতটা চেপে ধরলেন । তার চেহারাটা আমার এখনও মনে আছে । কি ব্যাকুলতা সেই কন্ঠে ! তার জীবনের সবথেকে শ্রেষ্ঠ সম্পদ সে আমার হাতে তুলে দিচ্ছে । একজন বাবার কাছে তার মেয়ের থেকে বড় কিছু আর হতে পারে না ।
আর আমি কি করছি ?
আমি অন্য একটা মেয়ের সাথে প্রেমময় খেলা খেলছি !
আমি সাথে সাথে ফোনটা কেটে দিলাম । মনে মনে নিশ্চিত হয়ে নিলাম যে এই নীতুর কাছ থেকে আমাকে দূরে দূরে থাকতে হবে । যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে ওদের বাসায় যাওয়াটাই বন্ধ করে দিতে হবে ।
ফোনটা কেটে দিয়ে আমি সুইট অফ করে দিলাম ।
ভাইয়ার বাসা থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে গেল । ফেরার পথে তৃষা টুকটাক কথা বলছিলো আমার সাথে । যে অস্বস্তি নিয়ে সে এসেছিলো, আমার মনে হল সেটা অনেকটাই কেটে গিয়েছে । এটা আমার কাছে বেশ ভাল লাগলো । যখন ওর হলের গেটের কাছে এসে হাজির হলাম তৃষা বলল,
-আচ্ছা আসি এখন ?
-আচ্ছা ।
-তোমার কি আগামী মঙ্গলবার কোন কাজ আছে ?
-মঙ্গলবার ? সকালে ক্লাস আর বিকেলে টিউশনী আছে ।
-আচ্ছা ঠিক আছে ।
-কিছু দরকার ছিল ?
-না না এমনি বললাম । রাত হচ্ছে, হলে যাও কেমন !
আমি আর কিছু জানতে চাইলাম না । তবে কেন জানি মনে তৃষা কিছু বলতে গিয়েও বলল না। আরও একটু জোর করলে কি মেয়েটা বলতো কথাটা ? কে জানে !
আমি নিজের হলের দিকে হাটা দিলাম !
|
|
চলবে....??
