গল্পঃ দ্বিতীয় বাসর | পর্বঃ (১১)
নীতুর কথাঃ
প্রতিদিন বাসায় যাওয়ার সময় এই একই স্থানে এসে জ্যামে আটকে থাকি । আজও রিক্সাটা একই স্থানে আটকে আছে কত সময় ধরে । আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে । কেমন যেন অসহায় অসহায় লাগছে । এই অনুভূতি আমি কাউকে বোঝাতে পারবো না । বারবার কেবল নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে এমনটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক । একটা ছেলে আর একটা মেয়ে পাশাপাশি বসে চা খাওয়ার মানেই তো আর এটা না যে ওদের মাঝে কিছু একটা চলছে !
কেন চলবে ?
নিলয় কেবল আমাকে ভালবাসে । আজ থেকে তো ভালবাসে না । সেই কবে থেকে বাসে ! আমাকে একটাবার দেখার জন্য ও কতটা সময় দাঁড়িয়ে থাকে । সেই নিলয় অন্য কোন মেয়েকে ভালবাসতেই পারে না । ওরা নিশ্চয়ই কেবলই বন্ধু । আর কিছু না ।
কিন্তু আমার কাছে এমন কেন মনে হচ্ছে ?
কেন খানিকটা অসহায় লাগছে নিজের কাছে ?
নিলয় মেয়েটার দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে ছিল । কেন তাকিয়ে ছিলো ?
তাহলে কি আমি একটু বেশি দেরি করে ফেললাম ?
আমি কেবল একটু বাজিয়ে নিতে চেয়েছিলাম ওকে । আমাকে অনেকেই পছন্দ করে সেটা আমি জানি । স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে কত মানুষের প্রেমপ্রস্তাব আমি পেয়েছি সেটার কোন ঠিক নেই । কিন্তু আমার ঠিক কাউকেই মনে ধরে নি । বারবার চেয়েছি এমন কাউকে ভালবাসতে যে আমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসবে না । আমাকে ছেড়ে যাবে না কখনও । কিন্তু এমন কাউকে পাই নি আমি । কত মানুষ আমাকে পছন্দ করেছে কিন্তু কদিন পরেই দেখতাম তারা আমি ছাড়া আরও অন্য মেয়েদের পেছনেও ঘুরতো । সবাইকে প্রস্তাব দিয়ে বেড়াতো । তাদের মনোভাবটা এমন ছিল যে সবাইকে প্রস্তাব দিয়ে রাখি, যে রাজি হয়।
আমি এমন কাউকে চাই নি কোনদিন । আমার কথা ছিল, যে আমাকে ভালবাসবে তাকে কেবল আমাকেই ভালবাসতে হবে । অন্য কারো দিকে তার চোখে যাবে না । তার চোখ কেবল আমার দিকেই নিবদ্ধ থাকবে ।
যখন বুঝতে পারলাম নিলয় আমাকে পছন্দ করে, প্রথমে ওকে একদমই পাত্তা দেই নি । মনে হয়েছে এমন কত ছেলেই না আমার পেছনে ঘুরে । তাদের ভেতরে নিলয়ও একজন । তবে আস্তে আস্তে লক্ষ্য করতে শুরু করলাম যে ছেলেটা আসলেই আমাকে পছন্দ করে । একটু খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলাম যে অন্য কোন মেয়ে নেই ছেলেটার জীবনে । কয়েকজন মেয়ে বন্ধু আছে । ওর সাথে পড়াশুনা করে । ব্যস । এবার আমার মনে হয়েছিলো যে এই ছেলেটা বুঝি সত্যি আমাকে পছন্দ করে এবং শুধু আমাকেই পছন্দ করে । আমি অপেক্ষা করতে শুরু করলাম ।
রিতুকে যখন নিলয় পড়াতে আসতো আমি চুপ করে নিজের ঘরে বসে থাকতাম । অন্যান্য সময় বাইরে বের হলেও এই সময়ে চেষ্টা করতাম নিলয়ের সামনে না পড়তে । একটা সময় মনে হল যে ছেলেটাকে কিছু সুযোগ দেওয়া উচিৎ । তারপর থেকে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতাম । মাঝে মাঝে আমাদের চোখাচোখি হত । তখন ওর চোখে যে আনন্দের আভাটা আমি দেখতাম সেটার কোন তুলনা নেই । আমার মনে হল এতোদিন পরে আমি আমার মনের মত কাউকে খুঁজে পেয়েছিলাম ।
তারপর একদিন আরও একটু সাহসের কাজ করে ফেললাম । আম্মুর ফোন থেকে নিলয়কে ফোন দিয়ে ফেললাম । নিলয় প্রথমে ভেবেছিলো হয়তো আম্মু কিংবা রিতুই ফোন দিয়েছে । তাই হ্যালো হ্যালো করতে থাকলো । কিন্তু কিছু সময় পরে চুপ করে গেল । কোন কথা বলল না আর । আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে ও ঠিকই বুঝতে শুরু করেছে । আমি ওর নিঃশ্বাস পড়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম । আমার কাছে এতো ভাল লাগছিলো যে আমি নিজেই বোঝাতে পারবো না । বুঝতে পারলাম যে এই ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয়েছে ।
কদিন আগে আমার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসে হাজির হল । আমি কি করবো বুঝতেই পারলাম না । কোন কিছু মাথায় আসছিলো না । শেষে আমার কান্না দেখে আম্মুই জানতে চাইলো যে আমি কাউকে পছন্দ করি কি না । আমি আর কোন উপায় না দেখে নিলয়ের নাম বলে দিলাম । আমি ভেবেছিলাম আম্মু হয়তো রাগ করবে অনেক কিন্তু আম্মু রাগ করলো না । বলল যে সে ব্যাপারটা দেখবে । নিলয়ের সাথে সে কথা বলবে । ঐদিন সন্ধ্যায় যখন আমি নাস্তার ট্রে নিয়ে হাজির হলাম নিলয়ের সামনে, ও আমার দিকে তীব্র বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছিল । এমনটা সম্ভবত এর আগে কোনদিন হয় নি এটার জন্যই অবাক হয়েছিলো খুব !
তবে সেদিন আমি ওর চোখের দৃষ্টিতে কেমন একটা পরিবর্তন দেখতে পেলাম । আর আজকে ওকে ঐ মেয়েটার সাথে দেখে আমার মনের মাঝে কেমন যেন করে উঠলো । এমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি কেন হচ্ছে?
আমি কি তাহলে দেরি করে ফেললাম ? ওকে কি একটু বেশি সময় ধরেই পরীক্ষা করছিলাম? ওর কি ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে !
যাক, আর কিছু আমি ভাবতে পারছি না । এখন যে কোন ভাবেই হোক, আমাকে আমার ভুলটা ঠিক করে নিতে হবে । বাসায় জানানো হয়ে গেছে । গতরাতে সম্ভবত আম্মু আব্বুকে নিলয়ের ব্যাপারে বলেছে । এবং সে রাজিও হয়েছে । নিলয় ছেলে হিসাবে ভাল । তাকে অপছন্দ হওয়ার কোন কারণ নেই । ওর পড়াশুনাও খুব জলদি শেষ হয়ে যাবে । আমার পড়ালেখা শেষ হতে হতে নিলয় কিছু একটা চাকরি জোগাড় করে ফেলবে ।
পরের শুক্রবারে দুপুরবেলা মায়ের ফোনটা হাতে পেয়েই আমি নিলয়কে ফোন দিলাম । ও গত দুইদিন রিতুকে পড়াতে আসে নি । রিতুকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল যে ওর নাকি কাজ আছে । পরের রবিবারে একেবারে আসবে । আমি ফোন দিয়ে যথরীতি চুপ করে রইলাম কিছু সময় । আজকে আমি ঠিক করে রেখেছিলাম যে ওর সাথে কথা বলবোই । নিজের ফোন থেকেই ফোন দিতে পারতাম কিন্তু কি মনে করে মায়ের ফোন থেকেই ফোন দিলাম ।
কিছু সময় চুপ থাকার পরে যখন আমি কথা বলতে যাবো তখনই লাইনটা কেটে গেল । আমি আবার যখন ফোন দিতে যাবো তখনই দেখলাম নিলয়ের ফোন বন্ধ । কেমন একটা অসহায়বোধ করতে লাগলাম । বারবার কেবল এই কথাটাই মনে হতে লাগলো যে কিছু একটা হয়েছে । কিন্তু কি হয়েছে সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম না ।
রবিবারে আমি সত্যিই একটা সাহসীকতার কাজ করে ফেললাম । সোজা গিয়ে হাজির হলাম ওর ডিপার্টমেন্টের সামনে । ওর ক্লাস শেষ হতে হতে বেলা বারোটা বাজবে । আরও কিছু সময় ও আড্ডা দিবে ক্যাম্পাসে । তারপর হলের দিকে যাবে । আমি সেই সময়েই ওর সামনে গিয়ে হাজির হব ।
অপেক্ষা করছিলাম উৎকন্ঠা নিয়ে । একটার দিকে নিলয়কে বের হয়ে আসতে দেখলাম । আমি বুকে দুরু দুরু ভাব নিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি, ও খানিকটা অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে । আমি বললাম,
-আজকে যাবেন না রিতুকে পড়াতে ?
-হ্যা, যাবো তো ।
-চলুন আমার সাথে । আজকে আম্মু আপনাকে একটু আগে আগে যেতে বলেছে ।
-তাই নাকি ?
-হ্যা । বিকেলবেলা রিতুকে নিয়ে আমরা একটু বাইরে যাবো ।
কথাটা মিথ্যা ছিল । আমার কেবল লক্ষ্য ছিল নিলয়ের সাথে রিক্সায় উঠবো । বাসায় গিয়ে সব ম্যানেজ করা যাবে । নিলয়ের চোখের দিকে মনে হল ও যেন খানিকটা দ্বিধান্বিতবোধ করছে । আমি বললাম,
-কোন সমস্যা ?
-না না । সমস্যা না । চল ।
রিক্সাতে যখন উঠলাম, আমি অনুভব করছিলাম যে ওর হাত একটু একটু যেন কাঁপছে । বুঝতে পারছিলাম ও অস্বস্তিবোধ করছে । এভাবে কোনদিন আমার সাথে কথা বলে নি । আজকে একেবারে আমার সাথে রিক্সাতে উঠতে হচ্ছে । নিলয় বরাবরই লাজুক ছেলে । আমি মনে মনে বললাম আজ থেকে তোমার সব লজ্জা আমি দূর করে দিবো । আমাকে এবার একটা সুযোগ দাও । যত অপেক্ষা করিয়েছি তার থেকেও বেশি কিছু দিবো তোমাকে ।
আমি হঠাৎ জানতে চাইলাম,
-আচ্ছা, আপনি না বাড়ি গিয়েছিলেন ?
-হ্যা !
ছোট করে জবাব দিলো সে ।
-ভাইয়ার বিয়েতে ?
প্রশ্নটার জবাব দেওয়ার আগেই বুঝতে পারলাম যে তার ফোন এসেছে । সে ফোন বের করলো । কানে ঠেকানোর কিছু সময় পরে দেখতে পেলাম তার চেহারার রং বদলে গেছে ।
-কোন হাসপাতাল ?
কিছু সময় নিরবতা ।
-আচ্ছা, আমি যাচ্ছি ।
নিলয় আমার দিকে তাকালো । তারপর বলল, আমাকে একটু যেতে হবে ধানমন্ডি ।
আমি বললাম, কি হয়েছে ?
-একজন হাসপাতালে আছে । ওর ওখানে কেউ নেই । আমি আসি কেমন ? রাতে আসবো পড়াতে । রিতুকে বলে দিও ।
তারপর রিক্সাওয়ালাকে বলল, এই রিক্সা থামো ।
আমাকে রেখেই নিলয় নেমে গেল । আমি ওর চেহারার ব্যাকুলতা দেখতে পেলাম । এমন ব্যাকুলতা কার জন্য ?
ঐ মেয়েটার জন্য কি ?
রিক্সা আবার চলতে শুরু করেছে । আমার কেন জানি খুব কান্না আসতে লাগলো । খুব বেশি কান্না আসতে লাগলো ।
|
|
চলবে......
